এই লকডাউনে অনেকেই অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। ব্যাপারটা ভীষণ ভালো। এভাবে যেমন অনেক মানুষ নিজেদের ইনডিপেন্ডেন্টলি রোজগারের ব্যাবস্থা করে নিচ্ছে তেমনি কনজিউমাররাও সময় বাঁচিয়ে নিজেদের প্রোয়জনীয় জিনিস বাসায় বসে পাচ্ছে। সাথে অনেক স্টুডেন্ট পার্টটাইম জব হিসেবে ডেলিভারির কাজে নিযুক্ত হয়ে নিজের হাত খরচের ব্যাবস্থা করতে পারছে। করোনা চলে গেলেও করোনার আগে থেকেই অনলাইনে কেনা-বেচার যে মার্কেটপ্লেস তৈরী হয়েছে তা আসলে আরো বিস্তারলাভ করবে। কিন্তু সব বিসয়েরই দুটো দিক আছে। তাই খারাপটা বলার আগে ভালোটা বলে নিলাম, নইলে অনলাইন উদ্যোক্তারা আমাকে পেটাতে পারে!
ধরুন, আপনি একটি শাড়ী কিনতে চাচ্ছেন । আপনার বাজেট পনেরশ টাকা । পছন্দের একটি পেজে ঢুকলেন। সেখানে স্ক্রল করতে করতে আপনি কিন্তু পাঁচটা নয় একসাথে পনেরটার ছবি দেখে ফেলেছেন । আপনি তখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবেন। পাশাপাশি সেই পেজে যদি ডিসকাউন্ট অফার থাকে পনেরশ’র একটি শাড়ির জায়গায় দুটি শাড়ী কেনার সুযোগ থাকে, আপনি সেই দিকে ঝুঁকবেন কিন্তু পরে দেখা যাবে সেই শাড়ীর কোয়ালিটির জন্য আপনাকে দু মাস পরে আবার শাড়ীর জন্য পেজে পেজে ঘুরতে হবে। এছাড়াও ফেসবুকে একবার একটি পেজে ঢুকলে সেই রিলেটেড দশটা পেজের সাজেশন আসে। বারবার টাইম লাইনে আসবেন আর শাড়ীর ছবি দেখবেন। নিজের অজান্তেই আরো দু একটা শাড়ী অর্ডার দিয়ে বসবেন। এই অনলাইনে আপনি যখন ঢুকছেন তখন নিজের অনিচ্ছা সত্বেও শত শত প্রোডাক্টের ছবি, ভিডিও বা রিভিউ দেখছেন । ধীরে ধীরে তা অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। আসলে আপনাকে বার বার কনজিউম করতে একপ্রকার বাধ্য করা হচ্ছে।

আপনার রাঁধতে ইচ্ছে হচ্ছে না । খাবার ডেলিভারির কোন অ্যাপে ঢুকলেন নিয়মিত সাধারণ খাবার অর্ডার করতে। কিন্তু বার্গার, পাস্তা, পিৎজার লোভনীয় ছবি দেখে কিন্তু আপনার মত পাল্টাতে ইচ্ছে হবে। আবার ধরুন আপনি পিৎজা অর্ডার করতেই ঢুকেছেন। দারুণ সুস্বাদু একটা পিৎজাও পেয়েছেন । সাত দিন পরে আবার খেতে ইচ্ছে করবে। তারপর আবার চার দিন পরে খেতে ইচ্ছে করবে । যাকে আমরা আদুরে ভষায় বলি ক্রেভিং! এরপরে আপনার পিৎজা খাবার টাকা না থাকলেও আপনি অন্তত আশি টাকার তেহারি অর্ডার করবেন । কারণ ইতোমধ্যে আপনার টেস্টের বারোটা বেজে গেছে এবং ধীরে ধীরে শরীরেরও বারোটা বাজছে।
আপনি টেকনো ফ্রেক! আপনি নিয়মিত আপডেট রাখছেন বাজারে কখন কোন নতুন ডিভাইস আসছে। আপনার একটি স্মার্টফোন থাকা সত্বেও তিন ক্যামেরা বিশিষ্ট ফোন কিনতে মন টানবে, ফুল সেট ক্যামেরা থাকলে ড্রোন লাগবে।
আমরা সবাই কম বেশি শুনে থাকি আমাদের আব্বু, আম্মু, চাচা, মামা থেকে শুরু করে সবাই বলতে থাকে আগে যে সংসার পনের হাজারে চালতো তা এখন ত্রিশ হাজারেও চলে না। সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। লাইফ এখন অনেক এক্সপেনসিভ! কেন? কারণ আগে আমরা একটা জিনিসকে কিভাবে নানানভাবে কাজে লাগানো যায় তা জানতাম। ফেলনা জিনিসকে আবার কি করে ব্যাবহারযোগ্যে পরিণত করা যাবে তা ভাবতাম। কিন্তু এখন সেই সময় নেই। আসলেই কি নেই? আসলেই কি আমরা দৌড়ের ওপর আছি নাকি আমাদের দৌড়ের ওপর রাখা হচ্ছে?
আমরা নিজের অজান্তেই নিজেদের দৈনন্দিন জীবণকে এক্সপেনসিভ করছি। কনজিউমিং এর ঠেলায় আর কাজের চাপে অতিষ্ট!

তবে কি অনলাইন শপিং খারাপ? অবশ্যই না। কিন্তু আপনি কনজিউমার হিসেবে কতটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রাখছেন তা নিয়ে ভাবা উচিত। কেনার আগে দেখা উচিত কখন আমার কোয়ালিটি লাগবে আর কখন কোয়ান্টিটি? যা কিনছি তা আদৌ কি দরকারী? ঠিক এখনই কি প্রয়োজনীয়? জীবণযাত্রাকে কিভাবে এক্সপেনসিভ না করে আরামদায়ক করা যায়? আর এই পুরো বিষয়টাই অভ্যাসের। অভ্যাসের দ্বারাই নিজেকে ইমপালসিভ কনজিউমার থেকে বুদ্ধিমান কনজিউমারে পরিণত করার যাত্রা আজ থেকেই শুরু হোক!
ইতি,
যে নিজেই অনলাইন কনজিউমিং এর ঠেলায় এখন ফকির!

লিখেছেন অতিথি লেখক: সানজিদা খানম
