শারীরিক ভাবে আমরা বর্তমানে অবস্থান করলেও মানসিকভাবে বেশিরভাগ সময় অতীত বা ভবিষ্যতে অবস্থান করি । তাই বর্তমানও হারাই, যা এক সময় অতীত হবে । ভবিষ্যতে ভালো কিছুর আশায় বর্তমান ব্যয় করি, সেটাও অনিশ্চিত । বাস্তবতা, বর্তমানে যা আছে, বর্তমান পরিবেশ আর পরিস্থিতির সাথে যত বেশি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবো তত বেশি মানসিক স্থিরতা, মনোসংযোগ, আত্মতৃপ্তি এবং বাস্তবকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন করবো ।
জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের আসল গতি-প্রকৃতি, আচরণ, চিন্তা-ভাবনা, চাওয়া, কে, কি, কেন ইত্যাদি সম্পর্কে যতটা সম্ভব সচেতন হওয়া । প্রায় সময়ই চিন্তা করি “নদীর ওপারে সর্বসুখ” বুঝি । এটা কতটা আর কিভাবে আমাদের ধাবিত করে এবং কাজে প্রভাব ফেলে তা খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ । লোভের বশবর্তী হয়ে আপাত দৃষ্টিতে যেটা ইতিবাচক এবং ফলপ্রসূ মনে হচ্ছে সেটার সাথে নেতিবাচক এবং অফলপ্রসূ কাজের বা সিদ্ধান্তের পার্থক্য বুঝতে পারতে হবে । অস্থিরতা এবং অসন্তোষ বা অতৃপ্তি প্রায় সময়ই আমাদেরকে এখন যা আছে তার চেয়ে আরো ভালো নতুন কিছু খুঁজে পেতে উদ্বুদ্ধ করে । সেটাকে খুব ইতিবাচক বা এটাই করা উচিত বা একমাত্র উপায় বলে মনে হয় । বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়ে অন্যান্য নতুন সম্ভাবনার প্রতি ঝোঁকে যাওয়াকেই গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করি । আমরা যতই বয়স্ক হতে থাকি, তত বেশি আত্মতুষ্ট হতে থাকি, ধীর-স্থির হতে থাকি । যৌবনের দিনের অস্থিরতা কল্পনা করে এবং সেটা অনুভব আমাদের যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং মন চাঙ্গা রাখে ।

এই অস্থিরতা সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই প্রয়োজন । এই অসন্তোষ, অতৃপ্তি আর অস্থিরতা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী হয় । সদা পরিবর্তনের এই ঝোঁক অস্পষ্ট যা নিজেরাও ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারি না এবং নিতান্তই একঘেয়েমির ফলাফল । জীবনের মূল্যবান অনেক সময় নষ্ট করে দেয় । কর্মজীবন যেভাবে যাচ্ছে সেটা নিয়ে সুখি না । তাই সেটায় পরিবর্তন আনতে চাই । পেশা পরিবর্তন করতে চাই । নতুন পেশার জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হয় শুরু থেকে । এই পেশার নতুন নতুন মানুষজনের সাথে পরিচয় হতে হয় । নেটওয়ার্ক বাড়াতে হয় । নতুন সব কিছুই আমাদের কাছে ভালো লাগে, এক্সসাইটিং মনে হয় । কিন্তু কয়েক বছর পরই এই নতুন কাজও আবার অপরিতৃপ্তকর, এক ঘেয়েমি হয়ে উঠে । অসন্তোষ তৈরী হয় । এটা আর এখন নতুন নেই । এই নতুন পথও ঠিক মনে হচ্ছে না আর । আগের কাজটিই ভালো ছিলো মনে হয় । আরো বেশি চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিলো অনুভব করি । আগের কাজে কি কি করলে সেটাকে ঠিক মতো ধরে রাখা যেতো এবং সেখানেই উন্নতি করা যেতো তা নিয়ে চিন্তা করি । ঐ কাজে এতদিন সময় আর শ্রম দিলে কোথায় থাকতে পারতাম সেটা ভেবে আফসোস করি । আগের কাজের সাথে যুক্ত বা একই ধরণের কাজ খুঁজতে থাকি আবার । কিন্তু সেখানেও নতুন অনেক কিছু শিখতে হবে, শুরু থেকে আবার শুরু করতে হবে । সবকিছু মিলিয়ে বেশ হতাশাজনক অবস্থায় পড়ে যাই ।

সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা প্রায় একই ধরণের কাজ করে থাকি । পারফেক্ট সঙ্গী পাবার জন্য বা আশায় আমরা সারাজীবন ব্যয় করতেই পারি কিন্তু তা করতে গিয়ে জীবনের বেশিরভাগ সময় আমাদের একাকীত্ব নিয়েই কাটাতে হয় । কেউ পারফেক্ট না । কেউ কারো জন্য পারফেক্ট হতে পারে না । বরং আমরা যদি নিজেদের সাথে এমন একটা সমঝোতায় আসি যে, অন্যের দোষ গুলোকে গ্রহণ করবো এবং তাদের দুর্বলতা গুলোর মাঝে তাদের সৌন্দর্য খুঁজে পাবার চেষ্টা করবো । পারফেক্ট বা আরো ভালো কাউকে পাবার আশা সরিয়ে বা দমিয়ে রাখি । আপোস-মীমাংসা বা কমপ্রোমাইজ করতে শিখি, শিখি কিভাবে একটা সম্পর্ক কাজ করে, ধরে রাখতে হয় । তার এবং নিজের দোষগুলো বা দুর্বলতার ব্যাপারে কিভাবে সমঝোতায় আসা যায় সেটা নিয়ে কথা বলি, দুজনই চেষ্টা করি । হাল ছেড়ে না দিয়ে ধৈর্য ধরে একটু একটু করে ইমপ্রোভ করি । কোন সম্পর্কই এমনি এমনি হয়ে উঠে না, সেটাকে তৈরী করে নিতে হয়, সেটাকে নিয়ে কাজ করতে হয়, শ্রম দিতে হয় । নতুন সম্পর্কে যাবার চেয়ে বর্তমান সম্পর্কটাকে কিভাবে আরো মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী আর আনন্দময় করা যায় সেটাতে মনোযোগ আর সময় দেই ।
পারফেক্ট সঙ্গী পাবার জন্য বা আশায় আমরা সারাজীবন ব্যয় করতেই পারি কিন্তু তা করতে গিয়ে জীবনের বেশিরভাগ সময় আমাদের একাকীত্ব নিয়েই কাটাতে হয় ।
আমরা নতুন নতুন সব ট্রেন্ডের প্রতি আকৃষ্ট হই । অন্যেরা যার প্রতি আকৃষ্ট হয় বা করছে তার সাথে নিজেকে তাল মেলাতে চেষ্টা করি । অন্যদের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাদের অনুসরণ করি । কেউ কোথাও গেলো, সেখানে যাওয়া লাগবে । কেউ কিছু খেলো, সেটা খাওয়া লাগবে । অন্যরা কিছু করলো, সেটা করা লাগবে । নিজেদেরকে অন্যের দ্বারা ভীষণ রকম প্রাভাবিত করছি । নিজেদের মুল্য অন্যদের দিয়ে যাচাই করছি । ও ওটা করে আমি ওটা করতে পারছি না, মানে আমি ওর সমকক্ষ না । বরং উল্টা হওয়া উচিত । আমি কে, কি চাই, কেন চাই, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা কি সে ব্যাপারে ভালো ভাবে জানা উচিত । নিজেকে জানা উচিত যতটা সম্ভব, যতভাবে সম্ভব । নিজের মূল্যবোধ, শক্তি, দুর্বলতা, ভালো লাগা, খারাপ লাগা ইত্যাদি সব-কিছু । আমি আসলেই নিজের জন্য কি চাই এবং বিজ্ঞাপন বা ভাইরাল হওয়া বা সোস্যাল মিডিয়া আমাকে দিয়ে কি করাতে চায় সেটা আলাদা করতে পারতে হবে ।

জীবন খুবই ছোট । আমাদের স্পৃহা বা শক্তি নির্দিষ্ট । পারফেক্ট বা আরো ভালো নতুন কিছু পাবার আশায় আমরা এই স্পৃহা আর শক্তির চরম অপচয় করি । সারাক্ষণ আরো ভালো কিছু পাবার আশায় এবং অপেক্ষায় না থেকে এখন যা আছে তার সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ । এখন যা আছে সেটাকে কিভাবে আরো ভালো করা যায়, ফলপ্রসূ করা যায়, সেটাকে কিভাবে ধরে রাখা যায়, আরো মজবুত করা যায় সে ব্যাপারে মনোযোগ দিলে আখেরে সেটা ভালো ফলাফল বয়ে আনে । কথায় বলে,
অপর পাশের ঘাস সময় সময় সবুজ মনে হয় । আসলে, যেখানকার ঘাসে আপনি নিয়মতি পানি দিবেন সেখানকাই ঘাসই সবুজ হয় ।
ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা যায়: আপনি এমন একটা পরিবেশে থাকেন যেখানে আপনার পরিচিত কিছু মানুষ আছে আর মোটামুটি কিছু নির্দিষ্ট জায়গাতেই আপনার গন্ডীর বেশিভাগটুকু সীমাবদ্ধ । নির্দিষ্ট কিছু কাজ, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ, নির্দিষ্ট কিছু জায়গা । এগুলোই আপনার বাস্তবতা । এগুলো নিয়েই আপনার জীবন । মানব প্রাকৃতির কারণে আমরা প্রায় সারাক্ষন এই বর্তমান বাস্তবতা এবং জীবন থেকে মানসিক ভাবে দূরে সরে থাকি । এগুলোকে আমরা খুব একটা আদতে নেই না । স্বপ্ন দেখি অন্য কোন সুন্দর জায়গায় যাবো । কবে যাবো সেটা নিয়েই চিন্তা-ভাবনা, প্ল্যান করি । কিন্তু যখন যাই তখন সে জায়গাটায়ও আসলে থাকি না । সেখানেও এমন কোন কিছুর খোঁজ করি যা আমার কামান-বাসনা কে পূর্ণ করবে । আমরা এমন সব বই পড়ি যার সাথে আমাদের বাস্তব জীবনের কোন মিল নেই । বইয়ে এমন সব কিছু থাকে যার সাথে আমাদের বাস্তব জীবনের কোন সম্পর্ক নেই । ফলে সেটা আমাদের মধ্যে আত্মতৃপ্তি তৈরী করার চেয়ে হাতাশার জন্ম দেয় বেশি । বইয়ে পড়া বাস্তবের সাথে অমিল জিনিষ আমরা পেতে চাই । অন্তত অনুভব করি অমন হলে জীবন কেমন হতো । সেটা আমাদের মধ্যে হতাশার তৈরী করে । আপনি এমন একটা ভুবতে ঘুরতে থাকেন যার সাথে আপনার পরিবেশ-পরিস্থিতি আর বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই । সেটা হবে না জেনে আরো বেশি কষ্ট পান । কিন্তু আপনি তো আপনার বাস্তবতার বাইরেও যেতে পারেন না ।

অন্য দিকে বাস্তবতা আপনাকে টেনে নিয়ে আসে বর্তমান পরিস্থিতিতে । সামনের বাস্তবতাই আপনার মনকে বার বার ব্যস্ত রাখে, দূরবর্তী কোন কল্পনা বা বাসনা থেকে । আর এ দুটোর অনুভূতির পার্থক্যও অনেক । একটা কল্পনায় আরেকটা বাস্তবে, চোখের সামনে । আপনার কাছের মানুষগুলো সাথে আরো গভীর ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন । আপনি কখনই তাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ জেনে শেষ করতে পারবেন না । তাই তাদের আরো বেশি বেশি করে জানাই আপনার একটা মজার আত্মতৃপ্তিকর কাজ হতে পারে । যা আপনার মধ্যে সম্পূর্ণতা বয়ে আনতে আর সম্পর্ক আরো মজবুত করবে । আপনার আশে-পাশের পরিবেশের সাথে আরো বেশি সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন । আপনি যেখানে আছে সেখানকার একটা ইতিহাস আছে যা আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে । আপনি হয়তো তা কখনও জানার চেষ্টা করেন নি । আপনার পরিবেশ বা বর্তমান অবস্থানকে জানা, বুঝা আপনাকে একদিকে সম্পূর্ণতা দিবে অন্যদিকে আপনাকে শক্তিশালী একজন হিসেবে গড়ে তুলবে । নিজের দিকে তাকালে দেখবেন, আপনার মধ্যে এমন কিছু লুকিয়ে আছে যা হয়তো আপনি নিজে কখনও চিন্তা বা কল্পনা করেন নি, জানতেন তো না অবশ্যই । নতুন ভাবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন । এটা যে কী ভীষণ রকম আত্মতৃপ্তি বয়ে আনে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । নিজেকে জানার মাধ্যমে নিজের প্রকৃতির দাস না হয়ে নিজেকে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ বা বুঝতে পারবেন কেন কি হচ্ছে আপনার মধ্যে, আপনার সাথে । নিজেকে ইতিবাচকভাবে গড়ে তোলার এ এক অসীম সম্ভাবনা । আপনার কল্পনার জগতকে চ্যালেঞ্জ করা এবং নিজেকে বার বার আবিষ্কার করা এক মহা আত্মতৃপ্তিদায়ক কাজ । ভার্চুয়াল জগৎ দ্বারা নিজেকে নির্ধারণ না করে নিজের সবচেয়ে কাছে নিজেকে নিয়ে যাওয়া । সত্যিকার আপনাকে আবিষ্কার করা, জানা । আর সব কিছু চলে গেলেও আপনি নিজেকে ছেড়ে তো থাকতে পারবেন না । আমৃত্যু নিজেকে নিয়েই থাকতে বাধ্য । তাই নিজেকে যতটা জানা যাবে জীবন ততটাই অর্থপূর্ণ, আনন্দময় আর সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে ।
দিন শেষে বাস্তবতা, বর্তমানে যা আছে আর বর্তমান পরিস্থিতির সাথে যত বেশি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবো তত বেশি মানসিক স্থিরতা, মনোসংযোগ এবং বাস্তবকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন করবো ।
The Laws of Human Nature by Robert Greene বই থেকে অনুবাদ করা ।
