Categories
বই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিজ্ঞান কি ও কেন?

নিষ্ঠা নিয়ে দেখা

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । আজ ষষ্ঠ অধ্যায়টি দেয়া হলো ।

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । আজ ষষ্ঠ অধ্যায়টি দেয়া হলো ।

এখন প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞান যে এভাবে জ্ঞান পাবার চেষ্টা করবে তার কায়দাকানুনটা কী রকমের হওয়া দরকার? কী ভাবে চেষ্টা করলে পর তবে এ-রকম জ্ঞান পাওয়া যেতে পারে?

ভেবে দেখা যাক ।

কার জ্ঞান? কী সম্বন্ধে জ্ঞান? প্রকৃতির জ্ঞান । প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান । যদি তাই হয় তহালে প্রকৃতির দ্বারস্থ না হয়ে মানুষ কি শুধুই মাথা খাটিয়ে এ-জ্ঞান পেতে পারে? নিশ্চয়ই নয় । শুধুমাত্র মাথা ঘামিয়ে আমি যে কথা জানবো তা যে মনগড়া কল্পনা হবে না, তার কোনো মানে নেই । বরং তা মনগড়া কল্পনা হওয়াই সম্ভবপর । সে-সব কথার সঙ্গে সত্যিকারের পৃথিবীর সম্পর্ক থাকবে কেমন করে?

আমি যদি প্রকৃতিকে সত্যিই জানতে চাই, বুঝতে চাই, তাহলে আমার পক্ষে সর্বপ্রথম দরকার প্রকৃতিকে দেখা-শুধু চোখ দিয়ে দেখা নয়, চেখে দেখা, শুঁকে দেখা, ছুঁয়ে দেখা, শুনে জানা । অর্থাৎ এককথায়, আমার ওই পাঁচটি ইন্দ্রিয়র সাহায্যে প্রকৃতির খবর যোগাড় করা ।

মনে মনে ধ্যান করে প্রকৃতিকে জানা যায় না । প্রকৃতিকে জানতে হলে তাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে জানতে হবে ।

বৈজ্ঞানিকেরা প্রকৃতিকে জানতে চান । তাই বৈজ্ঞানিকের প্রথম কাজ হলো প্রকৃতিকে দেখা । তুমিও তো অনবরতই প্রকৃতিকে দেখছো, আমিও তো অনবরতই প্রকৃতিকে দেখছি : চোখ দিয়ে দেখছি, কান দিয়ে শুনছি, জিভ দিয়ে চাখছি, নাক দিয়ে শুঁকছি, ত্বক দিয়ে স্পর্শ করছি । যেটুকু সময় ঘুমোচ্ছি সেটুকু না হয় আলাদা কথা । কিন্তু যতোক্ষণ জেগে রয়েছি ততোক্ষণ অনবরত এইভাবে আমাদের সবাইকার কাছেই প্রকৃতির খবর আসছে ।

কিন্তু তাই বলেই কি আমরা সবাই বৈজ্ঞানিক হয়ে গিয়েছি নাকি? তা নয় । আমরা সবাই চেষ্টা করলে, খেয়াল রাখলে, বৈজ্ঞানিক হতে পারি বইকি । কিন্তু সাধারণত আমরা প্রকৃতিকে যে ভাবে দেখি শুধু সেইভাবে দেখলেই বৈজ্ঞানিক হওয়া যায় না । কেননা, আমাদের পক্ষে সাোরণ ভাবে প্রকৃতিকে দেখা আর বৈজ্ঞানিকের পক্ষে বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রকৃতিকে দেখা-এই দুয়ের মধ্যে অনেক তফাত আছে ।

কী রকমের তফাত? এককথায়, তফাতটা হলো এই যে প্রকৃতিকে দেখবার ব্যাপারে বৈজ্ঞানিকেরা সাধারণের চেয়ে অনেক হুঁশিয়ার, অনেক বেশি নিষ্ঠাবান ।

এই কথা একটুখানি খুঁটিয়ে বোঝবার চেষ্টা করা যাক ।

আমাদের সাধারণ দেখাটায় প্রায়ই দেখার প্রতি নিষ্ঠা থাকে না, বৈজ্ঞানিকদের কাছে দেখবার সময় প্রধান কথা হলো দেখবার প্রতি নিষ্ঠা ।

আমাদের সাধারণ দেখাটা প্রায়ই অযত্নের দেখা, হেলাফেলা করে দেখা, এলোমেলো ভাবে দেখা । বৈজ্ঞানিকেরা দেখতে চান অনেক বেশি যত্ন নিয়ে, অনেক ভালো করে, গুছিয়ে, খতিয়ে ।

দেখার ব্যাপারে নিষ্ঠা আবার কী? দেখার ব্যাপারে যত্নই বা কী রকম? ধরা যাক, সূর্যগ্রহণ হচ্ছে । আমি সূর্যগ্রহণ দেখলাম, দেখলাম কালো ছায়ার সাজে রাহু এসে সূর্যকে গিলে ফেললো । বৈজ্ঞানিকও দেখলেন । কিন্তু তিনি রাহুকে দেখতে পেলেন না । তিনি শুধু দেখলেন, ছায়া পড়ছে সূর্যের উপর ।

ছবি: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

আমি সূর্যগ্রহণ দেখতে গিয়ে রাহুকেও দেখলাম কেন? কেননা, অনেকদিন থেকে আমি গল্প শুনেছি, রাহু সূর্যকে গিলে ফেলে বলেই গ্রহণ হয় । শুনতে শুনতে, শুনতে শুনতে, আমার মনে একটা গভীর সংস্কার জন্মে গিয়েছে । আমি যখন সূর্যগ্রহণ দেখলাম তখন ওই সংস্কার এসে আমার মনকে অনেকখানি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে । আমি সেই সংস্কারের প্রভাবে পড়ে অনেক কথা কল্পনা করে নিলাম । আর সত্যিই যা দেখছি তার ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিলাম এই কল্পনা । ফলে আমার দেখাটা নিছক দেখা হলো না । তার খানিকটা সত্যিকারের দেখা, খানিকটা কল্পনা ।

আমদের অনেকের মনে অনেক রকমের সংস্কার আছে । আমরা অনেক সময় সেইসব সংস্কারের মোহে পড়ি ।

আর যদি তাই পড়ি তাহলে কি প্রমাণ হবে না যে, দেখা বলে কাজটি সম্বন্ধে আমাদের মনে যথেষ্ঠ নিষ্ঠা নেই? যদি তা থাকতো, তাহলে আমরা মনের সংস্কারকে সরিয়ে রেখে ঠিক কী দেখছি, ঠিক কতোটুকু দেখছি-সে-বিষয়েই হুঁশিয়ার থাকবার চেষ্টা করতাম ।

বৈজ্ঞানিকেরা দেখেন । এবং দেখার প্রতি অগাঘ নিষ্ঠা তাঁদের ।  তাই তারা বলবেন, দেখবার সময়ে কোন রকম সংস্কারকেই আমল দেওয়া হবে না । ঠিক যতটুকু দেখতে পাবো নিছক সেইটুকুকেই দেখবো, তার বেশি কোনো কথা কল্পনা করে চোখে দেখাটুকুর ঘাড়ে তা চাপিয়ে দেবো না ।

ছবি: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

দেখবার প্রতি এই নিষ্ঠাটা খুবই বড়ো কথা । এ নিয়েই বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের মস্ত তফাত । ধর্ম বলবে, স্বচক্ষে দেখবার ওপর অতোখানি আস্থা রাখা কোনো কাজের কাজ নয় ।  কেননা, অনেক জিনিস আছে যা চোখে দেখতেই পাওয়া যায় না । মানতে হয় । বিশ্বাস করতে হয় । তবেই সে-জিনিস পাওয়া যায় । আগে দেখবো তবে মানবো-এমনতরো গোঁ ধরে থাকলে চলবে না ।

বিজ্ঞান বলবে, তা নয় । বিশ্বাস নয় । মানা নয় । দেখা । আর অযত্ন করে এলামেলো ভাবে দেখাও নয় । সংস্কার বাদ দিয়ে ভালো করে দেখা খুটিয়ে দেখা । বার বার দেখা ।

তাড়াহুড়ো করে দেখা নয় । তাতে ভুল হয়ে যেতে পারে । সুস্থ হয়ে, শান্ত ভাবে দেখা ।

যে-জিনিস আরো পাঁচ-রকম জিনিসের সঙ্গে মিশে জটিল হয়ে আছে তাকে যদি সেই অবস্থাতেই দেখবার চেষ্টা করি তাহলে ভুল হয়ে যাবার ভয় । তাই তাকে দেখবার সময় খুটিয়ে বিচার করে, বাকি জিনিসগুলো থেকে আলাদা করে নিয়ে, তবে দেখতে হবে ।

ছবি: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

এলোমেলো ভাবে, হুঁশিয়ার না হয়ে, দেখবার আয়োজন করলে সে দেখায় ভুল থাকতে পারে । তাই সাবধানে, নির্মল সংস্কারমুক্ত মনে, বিচার করে, শান্ত হয়ে তবে দেখতে হবে । অতএব বৈজ্ঞানিকদের এই দেখা আমাদের সাধারণজীবনের আটপৌরে দেখার মতো নয় । তাই এর জন্যে একটা ভালো নাম খুঁজে বের করা যাক ।

নিরীক্ষণ বা নিরীক্ষা । তার মানে দেখা-কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা যে-ভাবে দেখেন, সেই ভাবে ।


সূচি:
খবর পাবার খবর
পাঁচ-পাঁচটি খবর-দার
পণ্ডিতী না ইন্দ্রিয়
দেখলাম ধুঁয়ো জানলাম আগুন
অনুমানের গোড়ার কথা
দুনিয়ার নানান বিভাগ
নিষ্ঠা নিয়ে দেখা
দেখতে পাবার সীমানা বাড়ানো
ল্যাবরেটরি কেন ?
প্রকৃতির নিয়মকানুন মানে কী ?
জানা থেকে অজানায় ঝাঁপ
প্রত্যেক ঘটনারই কারণ আছে
কারণ মানে কী ?
কারণ আবিষ্কারের কায়দা
বিজ্ঞান মানে কি ?
কথাটা যে সত্যি তা বুঝবো কেমন করে ?
জ্ঞান বড়ো না কর্ম বড়ো
হাত আর মগজ
প্রকৃতিকে জয় করা আর প্রকৃতিকে জানা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *