গবেষণার উপর ভিত্তি করে সন্তান বড় করার দশটি ধাপ নিয়ে আলোচনা করো হলো । শেষ পর্ব দেয়া হলো এ পোস্টে ।
আগের (সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি-১) পোস্টে সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতির প্রথম পাঁচটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছি । এ অংশে বাকী পাঁচটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলো ।
ধাপ ৬: সুখী হওয়ার অভ্যাসগুলো শেখান
আমরা মাত্র ৬ নং ধাপে । আপনার মনে হতে পারে এতো কিছু আমারই মনে রাখা সম্ভব না, বাচ্চা কি করে রাখবে ? এই সমস্যার সমাধান করতে পারি ছোট ছোট “অভ্যাস” তৈরীর মাধ্যমে ।
এই ধাপ বা পদ্ধতি গুলোর কথা চিন্তা করলে বেশি বেশি মনে হবে কিন্তু অভ্যাস বশত করা খুব সহজ । একবার যদি এগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করা যায়, একটা একটা করে, তাহলে কঠিন বলে মনে হবে না । বাচ্চাদের স্থায়ী অভ্যাস তৈরী করা যায় কিভাবে ? গবেষণার উপর ভিত্তি করে কার্টার কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১. আগ্রহ বা উদ্দীপক বস্তু সরিয়ে ফেলা: প্রলোব্ধকারী এবং মনোযোগ কেড়ে নেয় এমন বস্তু তার কাছ থেকে সরিয়ে ফেলা ।
২. আশে-পাশের সবাইকে বলে দিন: উদ্দেশ্য ঠিক করুন যাতে আপনার আশে-পাশের লোকজন আপনাকে সাহায্য করতে পারে এবং একটা চাপের মধ্যেও থাকবেন যেহেতু সবাইকে বলে ফেলেছেন ।
৩. একবারে মাত্র ১টি উদ্দ্যেশ্য: একসাথে অনেক কিছু অর্জন করতে গেলে কোনটাই হয়ে উঠে না । তাই একই সময়ে ১টি মাত্র উদ্দেশ্য সাধনে মনোযোগ দিন । একটি মাত্র অভ্যাস তৈরী করুন ।
৪. সফল না হওয়া পর্যন্ত ওটাই করুন: খুব সহজে আর কম সময়ে কোন কিছু অর্জনের চেষ্টা করবেন না । সময় দিতে হবে । কাজ করে যেতে হবে । ভুল হবে । সেটাই স্বাভাবিক । কিন্তু ঐ উদ্দ্যেশ্য সাধনে কাজ করে যেতে হবে নিয়মিত । যতদিন না উদ্দেশ্য সাধন হয় ।

ধাপ ৭: নিয়মানুবর্তিতা বা শৃঙ্খলা শেখান
বুদ্ধিদীপ্ত বাচ্চাদের চেয়ে নিয়মানুবর্তী সম্পন্ন বাচ্চাদের ভবিষ্যতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি ।
এটা একটা গবেষণার ফলাফল । যে বাচ্চাদের লোভ কম, কোন কিছু পাবার জন্য ধৈর্য ধরে থাকতে পারে তারা ভবিষ্যতে অনেক সুখী হয় এবং অন্যদের থেকে বেশি পরিপূর্ণময় জীবন ধারণ করে ।
নিয়মানুবর্তীতা শেখানোর প্রথম ধাপ কি ? চাইলেই যে কোন কিছু পাওয়া যায় না এবং যে কোন কিছু পেতে গেলে ধৈর্য ধারণ করতে হয়, এটা শেখানো গুরুত্বপূর্ণ ।
চাইলেই আদর করে বা আপনি ছোট কালে চেয়ে পাননি বলে সন্তানকে সাথে সাথে কোনকিছু দিয়ে দিবেন না । তাদের অপেক্ষা করতে দিন । পুরো বছর কখন কি পাবে সেটার প্লান করুন একসাথে । সময়মতো দিয়ে দিন । তবে কোন শর্ত রাখবেন না দেয়ার জন্য । এটা করলে ওটা পাবে, এমন না ।
অভ্রর নিজের স্মার্ট ফোন নেয়ার ব্যাপারে তার সাথে কথোপকথন:
অভ্র: “বাবা, এই ‘হুয়াই’ ফোন টা দেখো তো । এটাই কিনবো । অন্নেক ভালো । সব গেম খেলা যায় এটাতে । হ্যাং করে না একদম ।”
আমি: “তাহলে বলছিস কেনো?”
অভ্র: “তখন কিনবো এটা! ফোনটাতে সব গেম খেলা যায় । ইউটিউব এ রিভিউ দেখেছি । তাই তোমাকে দেখিয়ে রাখছি । ১৫ বছর হলে এটাই কিনবো ।”
ধাপ ৮: ওদের সাথে বেশি বেশি খেলাধূলা করা
মনোযোগিতা (Mindfulness) এবং ধ্যান (Meditation) নিয়ে অনেক কিছু পড়ি বা দেখি । দু’টোই সুখী হওয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী ।
কিন্তু বাচ্চাদেরকে দিয়ে এগুলো করানো খুবই কষ্টসাধ্য । কাছাকাছি এমন কি আছে যা দিয়ে এগুলোর অভাব পূরণ করা যাবে ?
তাদের সাথে বেশি বেশি খেলাধূলা করা ।
খেলাধূলা করা মানে ফালতু ভাবে সময় নষ্ট করা না । তার মানসিকতা বৃদ্ধি আর শেখায় সাহায্য করা । খেলার ছলে ছোট খাটো বিষয়গুলো তাকে দেখানো, নিজে করা এবং করতে উদ্বোদ্ধ করা ।
কঠিন কোন নিয়ম-কানুনের প্রয়োজন নেই: খেলার জন্য বেশি সময় নির্ধারণ করুন, বাইরে নিয়ে যান আর তার সাথে তার মতো করে খেলুন । ঐ সময়টার জন্য তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিন । এইটুকুই ।
বাচ্চাকে খেলতে দিয়ে নিজে মোবাইল নিয়ে মোনাজাতে বসে যাবেন না দয়া করে । এই মোনাজাত আপনার সন্তানকে মোটেও সুখী করবে না বরং সন্তানের প্রতি আপনার অমনোযোগিতা প্রকাশ পাবে । সন্তানকে ব্যাস্ত রাখার বা খাবার খাওয়ানোর জন্য মোবাইল দিয়ে রাখা তো আরো ভয়াবহ পরিণাম বয়ে আনে ।

ধাপ ৯: আশে পাশের পরিবেশ ওদের সুখী করে এমনভাবে গড়ে তুলুন
পরিবেশ আমাদের উপর কতটা প্রভাব ফেলে তা আমরা অনেক সময় অবহেলা করি ।
চেষ্টা আর সময়ের দ্বারা উদ্দেশ্য সাধনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, কিন্তু পরিস্থিতি বা পরিবেশ সর্বদা আমাদের সমস্ত কিছুকে প্রভাবিত করে । বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ।
সুখী করার চেষ্টায় সফল হওয়া এবং বাচ্চার উপযোগী পরিবেশ তৈরী করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কি?
যত কম সম্ভব টিভি দেখা । প্রথমত নিজে এবং তারপর বাচ্চা ।
গবেষণা বলে, সুখী হওয়ার সাথে টিভি কম দেখা ওতপ্রোতভাবে জড়িত । তাই যত সম্ভব কম টিভি দেখার ব্যাবস্থা করতে হবে । নিজে তো অবশ্যই । বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও । যে সময়টা টিভি দেখবে সে সময়টা অন্য কোন কাজ বা খেলাধুলা করলে বাচ্চারা অনেক বেশি খুশি থাকে । তারা হাতে কলমে শিখতে পারে । যতক্ষন টিভি ততক্ষণ কোন কিছু চিন্তা করতে হয় না । দীর্ঘমেয়াদে তা চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে ।

ধাপ ১০: একসাথে খাবার খান
কখনও বিজ্ঞানের নতুন গবেষণা এমন কিছু বলে যা আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেক দিন থেকেই জানতেন, পালন করতেন । একসাথে খাবার খাওয়া এমনই একটা ব্যাপার ।
এই সাধারণ ঐতিহ্য বা কাজটিই বাচ্চাদের গড়ে উঠতে সাহায্য করে এবং সুখী সন্তানে পরিণত করে । তাই যৌথ পরিবারের বাচ্চারা সাধারণত বেশি সুখী থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বাচ্চারা পরিবারের সাথে নিয়মিত খাবার খায় তারা পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত কম নেশাগ্রস্ত এবং মদ্যপ হয় । তারা পড়ালেখায় ভালো করে । তাদের বিষাদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, বিশেষ করে কিশোর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে ।
তবে সন্তান বড় করা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একটি কবিতা অসারণ এবং কার্যকরী । সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি তাঁর জাদুকরী শব্দ ব্যাবহার করে তুলে ধরেছেন উপদেশ হিসেবে ।
তবে সন্তান বড় করা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর একটি কবিতা অসারণ এবং কার্যকরী । সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি তাঁর জাদুকরী শব্দ ব্যাবহার করে তুলে ধরেছেন উপদেশ হিসেবে ।
সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি
পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ সয়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে ।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লেখাটির প্রথম পর্ব সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি-১
