গবেষণার উপর ভিত্তি করে সন্তান বড় করার দশটি ধাপ নিয়ে আলোচনা করো হলো । প্রথম অংশ দেয়া হলো এ পোস্টে ।
প্রায় সব পিতা-মাতাই সুখী সন্তান চায় । সন্তান হাসি-খুশি থাকবে, সুখী সন্তান হিসেবে বড় হবে এটা চায় ।
কারণ সুখী সন্তানরা ভবিষ্যতে সফল, স্বার্থক এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে ।
এখন প্রশ্ন হলো, সন্তানকে সুখী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কি কি করতে হবে? গবেষণার উপর ভিত্তি করে সুখী সন্তান গড়ার দশটি ধাপ (Time এর একটি প্রবন্ধের অনুসরণে) নিয়ে আলোচনা করো হলো । সাথে এ সম্পর্কিত কবিগুরু রবি ঠাকুর এর একটি কবিতা বোনাস !
ধাপ ১: আগে নিজে সুখী হোন
স্বার্থপরের মতো মনে হলেও, সন্তানকে সুখী সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম ধাপ হলো প্রথমে নিজেকে সুখী করা ।
আপনি কতটা সুখী তার উপর নির্ভর করে আপনার সন্তান কতটা সুখী হিসেবে গড়ে উঠবে আর ভবিষ্যতে সফল ও পরিতৃপ্ত জীবনের অধিকারী হবে ।

সুতরাং, সুখী সন্তানের জন্য প্রথম ধাপ কি? প্রতি সপ্তাহে কিছু সময় ব্যায় করুন বন্ধু-বান্ধবের সাথে নিজেকে সুখী করার জন্য । প্রায়ই এমন কিছু করুন যা আপনার নিজেকে সুখী করবে ।
ধাপ ২: সন্তানকে সম্পর্ক তৈরী করতে শেখান
সম্পর্ক যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না – কিন্তু কয়জন মাতা-পিতা সত্যিকার অর্থে তাদের সন্তানকে সম্পর্ক তৈরীতে এবং সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝাতে, শিক্ষা দিতে যথেষ্ঠ সময় ব্যায় করেন?
(বাচ্চারা ঝগড়া করবেই । তাই বলে একে অপরের সাথে মিশতে না দিলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরীতে খুব বেশি আগাতে পারবে না ।)
আর এটা শেখাতে খুব বেশি কিছু করতে হবে না । ছোট-খাটো কাজে বাচ্চাদের উৎসাহ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে । অন্যের প্রতি দয়াবান হওয়ার মতো কাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে । শুধু নিজের কথা না ভেবে অন্যের দিক দেখা । নিজের খেলনাটা, খাবারটা, খেলার জায়গাটা অন্য কাউকে ভাগ দেয়া । দুজনে একসাথে খেলা । পাখি, বিড়াল বা কুকুরকে খাবার দেয়া । পোকামাকড় কে না মারা । এমন কিছু ।
সন্তানের সাথে মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা খুব ইতিবাচক প্রভাব ফেলে । বন্ধুর মতোই তার সাথে নিজের চিন্তা-ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গী শেয়ার করুন। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিন । ছোট বলে কিছু বুঝবে না বলে হেলা না করে তাকে চিন্তা করতে, বাস্তবতার কাছাকাছি যেতে সাহায্য করুন । সে যেনো সংসারের একজন ভাবে নিজেকে । আপনি যে তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন সেটা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলে । আপনার চিন্তা চেতনা তার উপর চাপিয়ে না দিয়ে তার মতো করে ভুল করতে দিন, বুঝতে দিন, বড় হতে দিন । দিন শেষে সেও একজন পরিপূর্ণ মানুষ ।

এই ছোটখাটো কাজগুলো বাচ্চাদের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে । ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে । গবেষণায় দেখা গেছে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বাচ্চাদের সুখী করে । তারা এ কাজগুলোতে খুব আনন্দ পায় ।
ধাপ ৩: নিপূণ বা সফল ভাবে কিছু করার চেয়ে চেষ্টা করাকে গুরুত্ব দিন
সব ঠিকঠাক হতে হবে, আমি যেভাবে চাই ঠিক সেভাবেই বাচ্চাকে চলতে হবে, বাঘিনী মা’দের অনুরোধ-ঠান্ডা করুন নিজেকে । শান্ত মাথায় ভাবুন কি করছেন ।
সব সময় বাচ্চাদের পিছনে লেগে থাকলে: এটা করো না, ওটা করো না, এভাবে করো না, ওভাবে করো না ইত্যাদি বাচ্চাদের মানসিকতা বা স্পৃহা নষ্ট করে ফেলে । তাদের মধ্যে হীনমন্যতা, অপরাধবোধ, জেদ বা রুক্ষতা, একাকীত্ব, লোকানোর, মিথ্যা বলার অভ্যাস ইত্যাদি তৈরী করে । আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে যায় তাদের । মা-বাবার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় । বিশ্বাস কমে যায় বলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে । ভয়ে থাকে ।
গবেষণা বলে: কোন কিছু পারলে যতোনা উৎসাহ দিবেন বা গুণগুণ গাইবেন, তার চেয়ে বেশি গুণগুন-গান যখন সে সত্যিকারভাবে চেষ্টা করছে, পারুক বা না পারুক । সে যে চেষ্টা করছে সেটাকে উৎসাহ দিন বেশি বেশি । সঠিকভাবে করার চেয়ে চেষ্টার গুরুত্ব বেশি তা বুঝান ।
কারণ কি? কারণ হলো আপনি যখন চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের গুণাগুন গান তারা সে কাজগুলো বেশি বেশি করতে চায় এবং করে । আখেরে যা তাদের সফল হতে সাহায্য করে । তারা কতটা স্মার্ট সেই চিন্তা না করে কতটা শিখতে পারছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে । পেরে যাওয়া মানে শেখা শেষ । সফলতা মানে কাজ শেষ । কিন্তু শেখার বিষয়টা পুরা অন্যরকম । শেখার কোনো শেষ নেই । সাফল্যের শেষ আছে ।
ধাপ ৪: আশাবাদ বা ভালো দিক দেখতে শেখান
কর্কশ স্বভাবের কিশোর চান না, তাই তো? তাহলে কিশোর হওয়ার আগেই তাকে শেখান সব কিছুর মধ্যে ভালো দিক কিভাবে খুঁজে পেতে হয় ।
বাচ্চাদের গবেষক আর্থার ক্রিস্টিন কার্টার সরাসরিই বলেছেন: “আশাবাদী আর সুখ এতটাই কাছাকাছি যে দুটোকে একই ধরে নেয়া যায় ।”
আশাবাদী আর নিরাশাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, আশাবাদীরা:
- পড়াশোনায়, কাজে এবং খেলাধূলায় অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করে
- সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় এবং বেশি দিন বাঁচে
- বৈবাহিক জীবনে সুখী এবং পরিতৃপ্ত থাকে
- বিষাদগ্রস্ততা এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকে
ধাপ ৫: মানসিক বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) শেখান
মানসিক বুদ্ধিমত্তা একটা দক্ষতা, জন্মগত গুণ না ।
যে সব বাচ্চারা এমনিতেই একটু ভাবুক প্রকৃতির তারা আবেগ কিছুটা হলেও বুঝতে পারে । কিন্তু ভাবুক মানেই মানসিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন না । দুটো দুই ব্যাপার ।
প্রথম ধাপ হলো “সহানুভূতিশীলতা, কোন আবেগটা কি বুঝতে পারা এবং স্বীকার করা” । বিশেষ করে যখন তারা রেগে যাচ্ছে বা হতাশ হচ্ছে কোন কিছু নিয়ে ।

অভ্র: “আমি তোমার উপর অনেক অনেক অনেক রাগ করেছি ।“
আমি: “তুমি আমার উপর রেগে আছো, অনেক রেগে আছো । কেনো রেগে আছো বলো তো ? গেম জোনে নিয়ে যাচ্ছি না বলে তুমি হতাশ হয়ে মন খারাপ হয়েছে? রাগ করেছো আমার উপর?”
অভ্র: “হুম!! আমি এক্ষুণি গেম জোনে যেতে চাই ।“
আমি: ”নিচ্ছি না বলে তুমি অনেক দুঃখ পেয়েছো, তাই না?” অভ্র: “হুম” (তারপর আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো । কাঁধের উপর মাথা রেখে বললো, চলো না যাই, প্লিজ ।)
বাচ্চার সাথে একাত্বতা প্রকাশ করুন । তাদের আবেগগুলো চিনতে সাহায্য করুন । কোন আবেগে সে কি করছে বা তার মধ্যে কি হচ্ছে তা বুঝতে দিন । আর সব আবেগই যে গুরুত্বপূর্ণ এবং দরকারি তা বুঝান । খারাপ ব্যাবহার করলে সেটা কেনো করা উচিত না সেটাও বুঝান ।
(অভ্র মিথ্যা বলার পর আমার মন খারাপ এবং কিছুক্ষণ পর আমাদের কথোপকথন)
অভ্র: “কি হয়েছে বাবা? তোমার মন খারাপ কেনো?”
আমি: “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, তুমি কম্পিউটারে গেম খেলেছো । কিন্তু আমি যখন জিজ্ঞেস করি তখন বলেছো গেম খেলোনি । তুমি মিথ্যে বলেছো । তাই আমার মন খারাপ ।“
অভ্র: “গেম খেলেছি বললে যদি রাগ করতে? তাই বলি নি। আমি তো মিথ্যা বলতে চাইনি ।”
আমি: “হুম, হয়তো একটু রাগ করতাম । কিন্তু মিথ্যা বলা বা লোকানো তো আরো খারাপ । এজন্য আরো বেশি রাগ করেছি, মন খারাপ হয়েছে আর কষ্ট পেয়েছি ।“
অভ্র: “তাহেল কি করবো? তোমাকে তো কষ্ট দিতে চাই নি।”
আমি: “কখনই মিথ্যা বলবে না বা কোন কিছু লুকাবে না । যা করেছো সেটাই বলবে । সত্য বললে রাগ করবো না আর দুঃখও পাবো না ।“ অভ্র: “সরি বাবা । আর বলবো না ।“ (তারপর এসে আমাকে হাগ দিয়ে রাখলো।)
এ লেখার প্রথম অংশ এখানেই শেষ হলো। দ্বিতীয় অংশ শীঘ্রই দেয়া হবে ।

One reply on “সন্তান বড় করার আদর্শ পদ্ধতি (পর্ব-১)”
Khub Valo legeche bondhu.🙂