Categories
বই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিজ্ঞান কি ও কেন?

দেখলাম ধুঁয়ো, জানলাম আগুন

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । আজ চতুর্থ অধ্যায়টি দেয়া হলো ।

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । আজ চতুর্থ অধ্যায়টি দেয়া হলো ।

আগের অধ্যায়:
খবর পাবার খবর
পাঁচ-পাঁচটি খবর-দার
পণ্ডিতী না ইন্দ্রিয়


পণ্ডিতেরা কি তাহলেই খুশী হয়ে যাবেন নাকি ?

মোটেই না ।

তাঁরা বলবেন, ইন্দ্রিয় নিয়ে আরো অনেক সমস্যা আছে, তর্ক আছে । তুমি ছেলেমানুষ, তোমাকে না হয় সে-সব তর্ক-বিতর্ক থেকে রেহাই দেওয়া হলো । কিন্তু তাই বলে, তোমাকে এক্ষুনি ছেড়ে দেওয়া হবে না । কেননা, এখানে আরো একটা মস্ত সমস্যা বাকি থাকছে ।

আবার কিসের সমস্যা ?

এতোক্ষণ তো শুধু এইটুকই বলা হলো যে ইন্দ্রিয়র সাহায্যে আমরা জ্ঞান পাই । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জ্ঞান কি আমরা শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় দিয়েই পাই নাকি ? তুমি বলবে, বারে, তা নয়তো কি ? চোখের দেখা দেখলুম বলেই তো জানলাম যে টবের ফুলটা অমন টুকটুকে লাল । কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেলো বলেই তো জানলুম যে পাশের বাড়ির নেড়ী গলা সাধছে ।

তা অবশ্য ঠিক । কিন্তু আবার এমন জিনিসের জ্ঞানও আমাদের হচ্ছে যা ইন্দ্রিয়গুলোর নাগালের একেবারে বাইরে । আর সে-রকম জিনিসের জ্ঞান হয় বলেই মানতে হবে, জ্ঞান-দাতা হিসেবে ইন্দ্রিয়রাই সব নয় । ইন্দ্রিয়র ওপর নির্ভর করা ছাড়ও আমরা অন্য ভাবে জ্ঞান পেতে পারি ।

নমুনা দিতে হবে ?

বেশ । কতো নমুনা চাই ?

ওদিকের মোড় থেকে হুসহুস করে ধুঁয়ো উঠছে । ধুঁয়োর দিকে চেয়েই চিৎকার করে উঠলাম, আরে আগুন লেগেছে যে !

অর্থ্যাৎ কিনা, খবর পেলাম । জানলাম । জ্ঞান হলো । কিসের জ্ঞান ? আগুনের ।

কিন্তু আগুন কি চোখে দেখেছি ? কই না তো, দেখেছি ধুঁয়ো । শুধু ধুঁয়ো । কিন্তু তাই বলে শুধু ধুঁয়োটুকুর কথা জানলাম না । জানতে পারলাম আগুনের কথাও ।

তাহলে, এও হলো জানবার আর এক রকম কায়দা । এই কায়দায় আমরা জ্ঞান পাচ্ছি, কিন্তু তা ইন্দ্রিয়র সাহায্যে নয়-অন্য কোনো ভাবে । কী ভাবে ? তাকে বলে অনুমান । ধুঁয়ো দেখেই আমি অনুমান করে ফেললাম যে ওখানে আগুন আছে ।

দেখলাম ধুঁয়ো, জানলাম আগুন
ছবি: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

কী করে অনুমান করলাম ? বারে, আগুন না থাকলে ধুঁয়ো উঠবে কোথা থেকে ? বিনা-আগুনে ধুঁয়ো ওঠে নাকি ?

অর্থাৎ কিনা, আগে থেকেই আমরা মনে মনে ঠিক করে রেখেছি, যেখানেই ধুঁয়ো সেখানেই আগুন । ওখানে ধুঁয়ো দেখলাম । অতএব বুঝলাম, ওখানে আগুন আছে ।

একটা লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে কোঁ কোঁ করছিলো । দেখেই বুঝলাম, লোকটাকে আগে মশায় কামড়েছে । কী করে বুঝলাম ? মশাকে চোখেও দেখি নি, চেখেও দেখি নি । দেখেছি শুধু লোকটার ম্যালেরিয়া জ্বর । তাই দেখেই আমি মশার কামড়টা অনুমান করে ফেললাম । কেননা, আমি আগে থাকতেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছি যে, যেখানেই ম্যালেরিয়া জ্বর সেখানেই মশার কামড় । মশার কামড় না হলে ম্যালেরিয়া হতে পারে না ।

তাহলে, যা এখন পৃথিবীতে নেই,-যা আগে ঘটেছিলো কিন্তু এখন ফুরিয়ে গিয়েছে, শেষ হয়ে গিয়েছে,-এমন জিনিস সম্বন্ধেও আমার জ্ঞান হতে পারে । মশার কামড়টা আগে ঘটেছিলো, অতীতের ব্যাপার । অথচ, অনুমানের সাহায্যে আমি অনায়াসেই তা জেনে ফেললাম ।

আবার, যে-ঘটনা পৃথিবীতে এখনো ঘটে নি, পরে ঘটবে-ভবিষ্যতে ঘটবে,-অনুমানের সাহায্যে এমন কি তাকেও জেনে ফেলা যায় । দুপুর বেলায় আকাশে দেখলাম কালো মেঘের ভিড় । দেখেই বুঝলাম, বিকেলের আগেই বৃষ্টি হবে । আর সর্বনাশ, বৃষ্টি হলে ফুটবল মাঠে হেরে ঢোল হয়ে যাবো । বৃষ্টির কথা জানলাম । হেরে ঢোল হবার কথা জানলাম । অথচ এখনো বৃষ্টিই হয়নি । হেরেও ঢোল হইনি ।

কিংবা বুকে ব্যথা । পিঠে ব্যথা । দারুণ জ্বর । ডাক্তার বাবু দেখেই বুঝলেন নিউমোনিয়া । অতএব, ডাক্তারবাবু একটা পেনিসিলিন ইনজেকসন দিয়ে দিলেন আর নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন কালকের মধ্যে জ্বর কমবে, ব্যথা কমবে । এখনো কিন্তু জ্বর কমে নি । ব্যথা কমে নি । কমবে । ভবিষ্যতের ব্যাপার । অথচ, ডাক্তারবাবু তা জেনে ফেললেন । কি করে ? অনুমান করে ।

অনুমান করা সম্ভব হলো, কেননা আগে থাকতেই তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন যে যেখানেই পেনিসিলিন সেখানেই নিমোনিয়া রোগ সেরে যেতে বাধ্য ।

দেখলাম ধুঁয়ো, জানলাম আগুন
ছবি: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

ইন্দ্রিয় দিয়ে আমরা শুধুমাত্র বর্তমানের জিনিসকে জানতে পারছি । পৃথিবীতে যা রয়েছে তার সঙ্গে ইন্দ্রিয়র সম্পর্ক ঘটলে তবেই ইন্দ্রিয়জ্ঞান । কিন্তু অনুমানের সাহায্যে আমরা জানতে পারছি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান । যা ছিলো কিন্তু এখন নেই, তাকেই বলে ভূত বা অতীত-যেমন ওই ম্যালেরিয়া রোগীর বেলায় মশার কামড়টা । যা এখনো ঘটে নি, পরে ঘটবে, তাকেই বলে ভবিষ্যৎ,-যেমন নিউমোনিয়া রোগীর জ্বর কমে আসা, যন্ত্রণা কমে আসা । আর পৃথিবীতে যা এখন রয়েছে, ঘটছে, তাকেই বলে বর্তমান,-যেমন ধুঁয়ো উঠতে দেখেই বোঝা গেলো ওখানে আগুন লেগেছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *