Categories
অনুবাদ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

শক্তি এবং গতি

পৃথিবীতে, মহাবিশ্বে সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে । মানুষ এবং জীবজন্তু সর্বদা নড়াচড়া করছে । গ্রহগুলো অবিরত সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করছে তো করছেই । এ সব কিছুর পেছনে কি কোন নিয়ম কাজ করে ?

পৃথিবীতে, মহাবিশ্বে সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে । মানুষ এবং জীবজন্তু সর্বদা নড়াচড়া করছে । গ্রহগুলো অবিরত সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করছে তো করছেই । এ সব কিছুর পেছনে কি কোন নিয়ম কাজ করে ?

অবশ্যই করে ! পৃথিবী এবং সারা বিশ্ব প্রাকৃতিক নিয়মে চলেছে, চলছে এবং চলবে । যে সব বিজ্ঞানিরা প্রকৃতির এ নিয়মকে বুঝার চেষ্টা করেন তাদের বলা হয় পদার্থবিদ বা প্রকৃতিবিজ্ঞানী । প্রাচীন কাল থেকেই পদার্থবিজ্ঞানীরা বিশ্বকে ভালোভাবে বুঝার জন্য যেসব প্রশ্ন করে এসেছেন সেগুলো অনেকটা এরকম: তুমি যখন আকাশের দিকে একটি বল ছুঁড়ে দাও সেটি এক সময় নিচের দিকে ফিরে আসে কেন ? এটি আকাশে ভাসতে থাকে না কেন ? একটি লাটিম যখন ঘুরাও অনন্তকাল সেটি ঘুরে না কেন ? কিছু সময় পর এটি ঘুরা বন্ধ করে দিয়ে স্থির হয়ে যায় কেন ? তুমিও হয়ত এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মনে মনে প্রশ্ন করেছ, ভেবেছ এবং উত্তর খুঁজার চেষ্টা করেছ । এবার চল দেখি এগুলোর কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় কি না ।

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলে পদার্থবিদদের আগে ভালভাবে বুঝতে হবে গতি কিভাবে কাজ করে । গতি কি ? গতি হলো যে কোন দিকে পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন / চলন / নড়া-চড়া । তুমি উপর, নীচ, পেছন এবং পাশা-পাশি দিকে যেতে পার । তুমি বৃত্তাকার আকারেও ঘুরতে পার । নড়াচড়া করতে, দোলতে, পাক খাওয়া, উল্টো দিকে ঘুরা, গড়াগড়ি খাওয়া, উল্টানো, বাঁকা হওয়া, যে কোন বস্তুকে ঘিরে পাক খাওয়া, কাঁপা ইত্যাদি অনেক রকম শারীরক কসরত করতে পার ।

-তুমি যখন গিটার বাজাও তখন তারটি কাঁপতে থাকে – খুব দ্রুত সামনে পেছনে যেতে থাকে । এটা এক ধরণের গতি ।

-উঁচু খাড়া পাহাড় থেকে যখন পানি গড়িয়ে পড়ে তখন ঝর্ণার সৃষ্টি হয় । এটা আর এক ধরণের গতি । -যখন তুমি একটা বলকে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দাও বলটি বক্রাকার পথে ভূমিতে নেমে আসে । এটাও এক ধরণের গতি ।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন
ভূমি থেকে প্রায় ২০০ মাইল উপরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ ষ্টেশন পৃথিবীর চারপাশে নির্দিষ্ট গতিতে অবিরত ঘুরছে । এটি প্রতি ৯০ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে (নাসা) ।

আসল ব্যপার হলো, কোন বস্তই নিজ থেকে গতি প্রাপ্ত হতে পারে না । যে কোন বস্তু গতি প্রাপ্ত হতে গেলে অন্য একটা শক্তি বস্তুটাকে ধাক্কা দিতে হবে বা নাড়াতে হবে ।

গতি হল ধাক্কা বা আকর্ষণ। উদাহরণ স্বরূপ: একটি বিড়াল তার থাবা দিয়ে একটি বলকে আঘাত করল, আর বলটি ঘরময় গড়াগড়ি শুরু করল । এখানে বলটিকে নাড়ানোর জন্য বিড়ালটি শক্তির ব্যবহার করছে । তুমি যখন একটি ফুটবলে লাথি দাও বা দরজা খুলার জন্য নব ধরে টান দাও, তখনও তুমি শক্তির ব্যবহার কর । তুমি যত বেশি শক্তিতে বস্তুকে আঘাত করবে বা টানবে, বস্তুটি তত দ্রুত নড়বে বা গতি প্রাপ্ত হবে ।

তুমি যখন পানিতে ঝাঁপ দাও তখন পানিতে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয় । চারদিকে পানি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে । তোমার পতনশীল শরীরে তৈরী হওয়া শক্তি পানিকে চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয় । (Shutterstock / John Wollwerth)
তুমি যখন পানিতে ঝাঁপ দাও তখন পানিতে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয় । চারদিকে পানি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে । তোমার পতনশীল শরীরে তৈরী হওয়া শক্তি পানিকে চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয় । (Shutterstock / John Wollwerth)

নির্দিষ্ট সময়ে একটি বস্তু যতদূর যেতে পারে তার হিসেব পাওয়াই হলো গতি । কিন্তু বস্তু সব সময় একই গতিতে চলে না বা নড়াচড়া করে না । শক্তি গতিশীল বস্তুর গতি বাড়াতে বা কমাতে পারে । “অতিক্রান্ত দূরত্বকে অতিবাহিত সময় দিয়ে ভাগ” দিলে যা পওয়া যায় তা হলো “গড় গতি” ।

শক্তিশালী পা থাকার কারণে চিতা পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী ।
শক্তিশালী পা থাকার কারণে চিতা পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী । শক্তিশালী পা দিয়ে শক্তিশালী আর দ্রত পদক্ষেপ দিতে পারে । তরুণ এই চিতাটি এক মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে পারে । চিতার গড় গতি = ১ ভাগ ১, বা প্রতি মিনিটে ১ মাইল । তবে চিতা সব সময় এই একই গতিতে দৌড়াতে পারে না । দৌড় শুরুর প্রথম চার সেকেন্ড সময় লাগে তার গড় গতিবেগে পৌঁছুতে । (Shutterstock / Villiers Steyn)
খেলোয়াড় যত শক্তিতে বলকে লাথি মারবে বা আঘাত করবে, বলটি তত বেশি গতি প্রাপ্ত হবে । (Shuterstock / CLS Design)
খেলোয়াড় যত শক্তিতে বলকে লাথি মারবে বা আঘাত করবে, বলটি তত বেশি গতি প্রাপ্ত হবে । (Shuterstock / CLS Design)

এখন প্রশ্ন হলো চলন্ত বস্তু চলতে চলতে গতি ধীর হয় এবং এক সময় থেমে যায় কেন ? উত্তর হলো “ঘর্ষণ” । ঘর্ষণ হলো আরেক প্রকার শক্তি। এক বস্তুর সাথে আরেক বস্তুর ঘষা লাগা বা পিছলে যাওয়াই হলো ঘর্ষণ । বরফের উপর স্কি করা এক ধরণের ঘর্ষণ। রাস্তায় চলন্ত গাড়ি, কার্পেটের উপর দিয়ে বল গড়িয়ে যাওয়া এ সবই ঘর্ষণের উদাহরণ । ঘর্ষণ চলন্ত বস্তুর গতি কমিয়ে দেয় ।

তুমি যদি একটি বলকে অমসৃণ, এবড়ো-থেবড়ো কোন কিছুর উপর দিয়ে গড়িয়ে দাও, দেখবে বলটি খুব দ্রুত তার গতি হারাচ্ছে । এবড়ো-থেবড়ো বস্তুর সাথে ঘর্ষণের ফলে বলটি খুব শীঘ্রই থেমে যাবে । কিন্তু খুব মসৃণ একটি কিছুর উপর দিয়ে যদি বলটিকে গড়িয়ে দাও তাহলে কি হবে ? যার কোন শেষ নেই বা মাঝখানে কোন দেয়াল বা বাধা নেই, অসীম লম্বা একটা মসৃণ সমতল টানেল ? বলটি কি অনন্তকাল গড়াতে থাকবে ? অবাস্তব মনে হলেও, উত্তরটি হবে ‘না’ । “ঘর্ষণবিহীন পৃষ্ঠ বা তল” বলে কিছু নেই । যখনই এক বস্তু আরেক বস্তুর ন্যূনতম সংস্পর্শে আসে তখনই ঘর্ষণের সম্মুখীন হয় এবং তা যত সামান্য পরিমাণেরই হোক না কেন, হবে-ই ।

খালি চোখে কোন বস্তুর পৃষ্ঠকে বা বস্তুটিকেই খুবই মসৃণ বলে মনে হতে পারে । কিন্তু যখনই তুমি ঐ বস্তুটিকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে অনেক গুণ বড় আকারে পর্যবেক্ষণ করবে, দেখবে যে ঐ আপাতদৃষ্ট মসৃণ পৃষ্ঠ কতটা এবড়ো-থেবড়ো । আর এই মারাত্মক ছোট এবড়ো-থেবড়ো পৃষ্ঠই ঘর্ষণের সৃষ্টি করে যখন অন্য বস্তুর সংস্পর্শে আসে । এমনকি বাতসের মধ্যে দিয়ে চলমান বস্তুও বাতাসের সাথে ঘর্ষণের সৃষ্টির সম্মুখীন হয় ।

ঘর্ষণ যত কম হবে গতিময় বস্তুর গতি তত বেশি সময় বিদ্যমান থাকবে । ধর, তুমি যদি ক্যাডস জুতা পড়ে রাস্তায় পিছলে যেতে চাও, খুব বেশি দূর যেতে পারবে না । হয়ত পড়েই যাবা । কিন্তু ঐ একই জুতা পড়ে যদি টাইলস ওয়ালা কোন বারান্দায় পিছলে যেতে চাও অনেক দূর যেতে পার । স্কুলে কম বেশি সবাই এটা করে থাকে । মসৃণ পৃষ্ঠের উপর দিয়ে অনেক দূর যেতে পার, কারণ রাস্তা থেকে ওখানে ঘর্ষণ কম হয় । ঘর্ষণ যত বেশি, বাধা তত বেশি, এবং দ্রুত থেমে যেতে হয় । ঘর্ষণ যত কম, বাধাও তত কম, এবং অনেক বেশি দূর যাওয়া যায় ।

যখন পৃষ্ঠ মসৃণ থাকে তখন ঘর্ষণ কম থাকে ফলে বস্তু দ্রুত অগ্রসর হয় । টিউবের ভেতর দিকের মসৃণ পৃষ্ঠ এবং বরফের পৃষ্ঠ মসৃণ হওয়ায় খুব সহজেই অনেকদুর যাওয়া যায় । (Shutterstock / Tammy Kay Photo)
যখন পৃষ্ঠ মসৃণ থাকে তখন ঘর্ষণ কম থাকে ফলে বস্তু দ্রুত অগ্রসর হয় । টিউবের ভেতর দিকের মসৃণ পৃষ্ঠ এবং বরফের পৃষ্ঠ মসৃণ হওয়ায় খুব সহজেই অনেকদুর যাওয়া যায় । (Shutterstock / Tammy Kay Photo)

কিছু শক্তি আছে যে গুলো দেখা যায় না, অদৃশ্য এবং এরা স্পর্শ না করেই অন্য বস্তুকে নাড়াতে পারে। তুমি হয়ত চুম্বক নিয়ে খেলেছ এবং খেয়াল করেছ লোহা এবং স্টিলের প্রতি চুম্বকের বিশেষ আকর্ষণ ক্ষমতা কাজ করে । এদের কাছাকছি এলেই একটি আরেকটির দিকে যেতে থাকে । একটি চুম্বকের দুটি মেরু থাকে । উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু ।

পৃথিবী হলো বিশাল আকৃতির (কিন্তু দুর্বল) একটি চুম্বক । একটি কম্পাসের কাটাকে ঘুরিয়ে উত্তর মেরুর দিকে ঘোড়ানোর মতো ক্ষমতা সম্পন্ন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র । (Shutterstock / Triff)
পৃথিবী হলো বিশাল আকৃতির (কিন্তু দুর্বল) একটি চুম্বক । একটি কম্পাসের কাটাকে ঘুরিয়ে উত্তর মেরুর দিকে ঘোড়ানোর মতো ক্ষমতা সম্পন্ন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র । (Shutterstock / Triff)

চুম্বকের আচরণ রহস্যপূর্ণ মনে হতে পারে । কারণ এটি বস্তুকে স্পর্শ না করেই আকর্ষণ বা নাড়াচাড়া করতে পারে । কিন্তু আরেকটি অদৃশ্য শক্তি আছে, প্রতি মুহুর্তে তুমি এর সংস্পর্শে থাক যা তোমার কাছে অবধারিত বা খুবই স্বাভাবকি বলে মনে হয় । আছে বলে মনেই হয় না । শক্তিটি হলো “মাধ্যাকর্ষণ শক্তি” । মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই হলো সেই অদৃশ্য শক্তি যা আমাদেরকে পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগে আটকে থাকতে সাহায্য করে । পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমস্ত বস্তুকে তার কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে । তাই তুমি যখন একটি বই হাত থেকে ছেড়ে দাও সেটি ভাসতে না থেকে নীচের দিকে নেমে আসে । তুমি যখন লাফ দাও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তোমাকে মাটির দিকে টেনে আনে ।

ফোয়ারার পানি প্রত্যেকটা পাইপ থেকে সজোরে উপরের দিকে ছুড়ে দেয়া হয় । মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাদের প্রত্যেকটিকে অর্ধাকার বৃত্তাকারে নীচের দিকে নামিয়ে আনে । (Shutterstock / Cristina Perez)
ফোয়ারার পানি প্রত্যেকটা পাইপ থেকে সজোরে উপরের দিকে ছুড়ে দেয়া হয় । মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাদের প্রত্যেকটিকে অর্ধাকার বৃত্তাকারে নীচের দিকে নামিয়ে আনে । (Shutterstock / Cristina Perez)

প্রত্যেকটি বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে । হোক এটা পৃথিবী, সূর্য, একজন ব্যক্তি বা একটি মার্বেল । যে বস্তুর “ভর” যত বেশি সে বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তত বেশি । ভর হলো ঐ বস্তুটিতে মোট যতটুকু উপাদান / ধাতু / জিনিস /  পদার্থ আছে । কিছু বস্তুতে অন্য বস্তুর তুলনায় বেশি ঘন আকারে উপাদান থাকে । যেমন তুলা এর তুলনায় লোহায় উপাদানের ঘনত্ব অনেক বেশি । তাই আয়তনে সমান হলেও লোহার ভর অনেক বেশি থাকে । এক বস্তা তোলা আর এক বস্তা লোহা যেমন । এক্ষেত্রে লোহার ভর অনেক বেশি হবে । কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তোলার মাঝখানে মাঝখানে অনেক ফাঁকা জায়গা থাকে কিন্তু লোহার ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত । একেবারে ঘন । কিন্তু মূল ব্যাপার হলো একটা বস্তু খুব বড় না হলে, যেমন গ্রহ বা তারা, তাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত দুর্বল থাকে যে, তা কোন কিছুতে প্রভাব ফেলতে পারে না ।

পৃথিবী এবং চাঁদের শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে আর এ কারণেই একটি আরেকটিকে নিজের দিকে টেনে রাখে । যদিও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি  পৃথিবীর মতো অতটা না, তবুও ঐ আকর্ষণের ফলে পৃথিবীর সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি করে । কিন্তু, পৃথিবী ও চাঁদ যদি একটি আরেকটিকে এভাবে আকর্ষণ করে তাহলে তারা একে অপরের উপর আছড়ে পড়ে না কেন ? পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে চাঁদ তার কক্ষপথে আটকে আছে । কিন্তু চাঁদের কক্ষপথে ঘোড়ার এই গতির জন্যই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ছে না । চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার গতি কমলেই এটা পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়বে । আবার গতি যদি বেড়ে যায় তাহলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে অগ্রহ্য করে ছুটে বেড়িয়ে যাবে ।

সমূদ্রে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয় । চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমূদ্রের পানি ফাঁপিয়ে তোলে ফলে “জোয়ার” এর সৃষ্টি হয় । (Shutterstock / Blue Ring Media)
সমূদ্রে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয় । চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সমূদ্রের পানি ফাঁপিয়ে তোলে ফলে “জোয়ার” এর সৃষ্টি হয় । (Shutterstock / Blue Ring Media)

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন এ ধরনের সমস্ত বিষয়ের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, গ্রহের কক্ষপথ ও তাদের আবর্তন থেকে শুরু করে বস্তু কিভাবে নড়াচড়া করে ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে তার ব্যাপক আকর্ষণ ছিল । তাঁর অনেক আবিষ্কারের মধ্যে নিউটনের গতির প্রথম সূত্র ছিল অন্যতম ।

গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিউটন দেখিয়েছেন যে, বস্তু যে অবস্থায় থাকে সে অবস্থায়ই অবস্থান করতে চায় । যে বস্তু স্থির অবস্থায় আছে সেটি স্থির অবস্থায়ই অবস্থান করে । যে বস্তু চলমান সে বস্তু চলমানই থাকতে চায় । একটি স্থির বস্তু স্থির থাকে বা একটি চলমান বস্তু একই পথে সোজা চলতে থাকে যদি না অন্য কোন বাইরের শক্তি তাদের ধাক্কা দেয় বা টেনে ধরে । বস্তু চলমান থাকুক বা স্থির থাকুক, তারা তাদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনে প্রতিরোধ বা বাঁধার সৃ্ষ্টি করে । বস্তু তার বর্তমান অবস্থা বা অবস্থান থেকে তার পরিবর্তন করতে চায় না । একে বলে “জড়তা” ।

সিটবেল্ট গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার মুল কারণ হলো জড়তা । ধর, তুমি গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছ । গাড়ি আচমকা ব্রেক কষল । এখন গাড়ি থেমে যাবে কিন্তু তুমি সামনের দিকে যেতেই থাকবে । সিটবেল্ট তোমাকে সামনে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা করবে ।

জড়তার উদাহরণ: স্কেটবোর্ডের সামনের চাকাটি আচমকা বাধার সম্মু্খিন হয় এবং থেমে যায় কিন্তু আরোহী চলমান থাকে । (Shutterstock / Oleksandr Lysenko)
জড়তার উদাহরণ: স্কেটবোর্ডের সামনের চাকাটি আচমকা বাধার সম্মু্খিন হয় এবং থেমে যায় কিন্তু আরোহী চলমান থাকে । (Shutterstock / Oleksandr Lysenko)

একটা পরীক্ষার মাধ্যমে জড়তাকে আমরা আরো ভালভাবে বুঝতে চেষ্টা করি । টেবিলে একটি পেপার রাখ । তার উপর কয়েকটা বিভিন্ন ওজনের বস্তু যেমন, কলম, পেপার ওয়েট, ছোট বই ইত্যাদি রাখ । তারপর হঠাৎ করে যত দ্রুত সম্ভব নীচের কাগজটিকে যে কোন একদিকে হেচকা টান দিয়ে সরিয়ে নাও । দেখবে বস্তুগুলো টেবিলের প্রায় ঐ জায়গায় আছে কিন্তু পেপারটি তল থেকে নাই হয়ে গেছে। ওয়াও ! কিভাবে এটা সম্ভব হলো ? কাগজের উপরের বস্তুগুলো তো কাগজের সাথেই চলে যওয়ার কথা । কিন্তু কি হলো ? তুমি জাদু জান না তো ? জানতেও পার ! কিন্তু এখানে আসলে ঘটেছে নিউটনের প্রথম গতি সূত্রের প্রয়োগ । বস্তুগুলো তাদের অবস্থানে অবস্থান করে কারণ জড়তার কারণে বস্তুগুলো তাদের বর্তমান অবস্থায় অবস্থান করতে চায় । নীচের কাগজটি দ্রুত সরিয়ে নেয়ার ফলে যথেষ্ঠ পরিমাণ শক্তির উৎপন্ন হওয়ার সময় পায় নি এবং তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তনে ব্যর্থ হয় । এখানে উল্লেখ্য যে, এটি সফলভাবে করতে তোমাকে বেশ অভিজ্ঞ হতে হবে । প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য ধীরে কাগজটি টান দিলেই উপরের সব বস্তু অবস্থান পরিবর্তন করবে এবং আর কাজ করবে না ।

মজার ব্যাপার হলো, উপরের বস্তুগুলো যত বেশি ভারি হবে, পরীক্ষাটি তত সহজ ও সফলভাবে করা যাবে । কারণ ? যে বস্তুর ওজন যত বেশি হবে ঐ বস্তুর “জড়তা” তত বেশি । পেপার ওয়েটকে সরাতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন একটি কলমকে সরাতে তার চেয়ে অনেক কম শক্তির প্রয়োজন হয় । একটি পেপার ওয়েট এবং একটি কলম ছুড়ে মারলে অবশ্যই কলমকে থামানো অনেক সহজ । কারণ এটি হালকা ।

ভার বনাম ওজন: যে কোন বস্তু মহাবিশ্বের যে কোন স্থানেই থাকুক না কেন তার ভার একই থাকে । এর কারণ হলো ঐ বস্তুর ‘উপাদানের’ কোন পরিবর্তন হয় না, সব সময় সব জায়গায় একই থাকে । ওজন হলো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বস্তুকে তার কেন্দ্রের দিকে যে আকর্ষণ করে বা টানে তা । তুমি তোমার ওজন অনুভব কর কারণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তোমাকে তার কেন্দ্রের দিকে সব সময় টানছে এবং ভূমি তোমাকে আটকে রাখছে । ফলে অবস্থান সাপেক্ষে বস্তুর ওজনের তারতম্য হতে পারে । পৃথিবীতে একটি বস্তুর ওজন ৬০ পাউন্ড হলে চাঁদে হবে মাত্র ১০ পাউন্ড । কারণ চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ । যদিও তোমার ভার একই থাকবে, চাঁদে তুমি নিজেকে অনেক হালকা অনুভব করবে । পৃথিবীতে তোমার ওজন যদি হয় ৬০ কেজি হয় চাঁদে হবে মাত্র ১০ কেজি । কিন্তু তোমার ভার একই থাকবে, কারণ তোমার শরীরের উপাদান পৃথিবীতে যা ছিল চাঁদেও তাই থাকবে ।

বায়ুর চাপ এক ধরণের ঘর্ষণ । পড়ন্ত শরীরকে বায়ুর অণু মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে উপরের দিকে ধাক্কা দিতে থাকে । বায়ুর ঘর্ষণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে এক ধরনের বিপরীতমুখী চাপ সৃষ্টি করে । বায়ুর চাপ এতটা শক্তিশালী নয় যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে হারিয়ে পড়ন্ত বস্তুকে উপরে ভাসিয়ে রাখবে । কিন্তু যতটা দ্রুত পড়ার কথা তার থেকে অনেক ধীর গতিতে পড়তে সাহায্য করে । এভাবে পড়ন্ত বস্তু ভার ও আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতিতে পৌছে । একে বলে “প্রান্তিক গতি” (terminal velocity) ।

এই স্কাইডাইভাররা “উন্মুক্ত পতন” অবস্থায় আছে । আড়াই মাইল উচ্চতায় বিমান থেকে ঝাঁপ দিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে তারা ভুমির দিকে নেমে আসছে । প্যারুশুট খোলার আগ পর্যন্ত একমাত্র “বায়ুর চাপ-ই” তাদেরকে অপেক্ষাকৃত ধীর নামতে সাহায্য করছে । এভাবে পড়ন্ত স্কাইডাইভাররা ঘন্টায় ১২০ মাইল এর বেশি গতিতে মাটিতে আছড়ে পরবে না । কিন্তু কোন একজন স্বাইডাইভার যদি আলাদা হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অবস্থায় অবস্থান করে, বায়র চাপ কমার ফলে ঘন্টায় ২০০ মাইল বেগে ভূমিতে আছড়ে পড়বে । তুমি যখন “উন্মুক্ত পতন” অবস্থায় থাকবে তখন তুমি নিজেকে ওজনশূণ্য মনে হবে । তুমি কোন ওজনই অনুভব করবে না । (Shutterstock / Germanskydiver)
এই স্কাইডাইভাররা “উন্মুক্ত পতন” অবস্থায় আছে । আড়াই মাইল উচ্চতায় বিমান থেকে ঝাঁপ দিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে তারা ভুমির দিকে নেমে আসছে । প্যারুশুট খোলার আগ পর্যন্ত একমাত্র “বায়ুর চাপ-ই” তাদেরকে অপেক্ষাকৃত ধীর নামতে সাহায্য করছে । এভাবে পড়ন্ত স্কাইডাইভাররা ঘন্টায় ১২০ মাইল এর বেশি গতিতে মাটিতে আছড়ে পরবে না । কিন্তু কোন একজন স্বাইডাইভার যদি আলাদা হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অবস্থায় অবস্থান করে, বায়র চাপ কমার ফলে ঘন্টায় ২০০ মাইল বেগে ভূমিতে আছড়ে পড়বে । তুমি যখন “উন্মুক্ত পতন” অবস্থায় থাকবে তখন তুমি নিজেকে ওজনশূণ্য মনে হবে । তুমি কোন ওজনই অনুভব করবে না । (Shutterstock / Germanskydiver)

বল বা শক্তি, গতি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, ভার এবং ঘর্ষণ এরা আমাদের পৃথিবীকে, মহাবিশ্বকে পরিচালনা করে । এগুলো খুবই জটিল ব্যাপার । কিন্তু যখন তুমি এদের বুঝতে পারবে তখন তোমার চারপাশ ও চারপাশে ঘটা ঘটনাগুলোকে আরো পরিষ্কার ভাবে ব্যখ্যা করতে বা বুঝতে পারবে । প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য তোমার কাছে আর অস্বাভাবিক বা অলৌকিক বলে মনে হবে না । প্রকৃতির স্বাভাবকি ঘটনাকে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যখ্যা করতে পারবে বলে নিজেকে আরও পরিপূর্ণ বলে মনে হবে ।

মূল লেখা: মার্গারেট মিটেলব্যাক
মূল লেখা এখানে

2 replies on “শক্তি এবং গতি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *