দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । আজ পঞ্চম অধ্যায়টি দেয়া হলো ।
এইটুকু শুনে তুমি যদি বলে বসো যে ইন্দ্রিয়র চেয়েও অনুমান ঢের ভালো, তাহলে কিন্তু তোমার কথাটা ভয়ানক ভুল হয়ে যাবে । কেননা, ইন্দ্রিয়র তুলনায় অনুমানের কতকগুলো সুবিধে থাকলেও ভালোমন্দর কথা অতো সহজে বলা যায় না । দশদিক ভেবে চিন্তে কথা বলবার অভ্যাস করতে হবে ।
অনুমান বলে জানবার কায়দাটাকে ভালো করে বিচার করা যাক ।
দেখলাম ধুঁয়ো । জানলাম আগুন । কী করে জানলাম? বারে, আগুন না থাকলে ধুঁয়ো উঠবে কেমন করে?
এই ব্যাপারটাকেই আরো একটু খুঁটিয়ে আরো ফলাও করে বোঝবার সুবিধে হবে, যদি একটা নির্ভুল অনুমানের সঙ্গে একটা ভুল অনুমানের তুলনা করা যায় ।
যেখানেই ধুঁয়ো সেখানেই আগুন থাকতে বাধ্য ।
ওখানে ধুঁয়ো রয়েছে ।
অতএব, ওখানে আগুন থাকতে বাধ্য ।
এই তো হলো আমাদের যুক্তি । কিন্তু কেউ যদি বলতো, যেখানেই ধুঁয়ো সেখানেই বাঘ থাকতে বাধ্য ।
ওখানে ধুঁয়ো রয়েছে ।
অতএব, ওখানে বাঘ থাকতে বাধ্য ।
তাহলে? তাহলে সেও একটা কথা অনুমান করতো বই কি । কিন্তু তার অনুমানের সঙ্গে আমাদের অনুমানের তফাত আছে । কী তফাত? তারটা ভুল আর আমাদেরটা ঠিক, নির্ভুল ।
অথচ, চেহারার দিক থেকে দুটো অনুমানই কি মোটের ওপর একই রকমের নয়? হুঁ । দেখতে মোটের ওপর এক রকমের বই কি । তাহলে, এমন তফাত হলো কেন? একটা ঠিক আর একটা বেঠিক হলো কী করে? সে-আর এমন কি কঠিন প্রশ্ন? প্রথম অনুমানটা ঠিক, কেননা তার বেলায় যে-কথা বলে শুরু করা হচ্ছে সেই কথাটা ঠিক ।
ধুঁয়ো থাকলে সত্যিই আগুন থাকবে । যেখানেই ধুঁয়ো সেখানেই সত্যিসত্যি আগুন থাকতে বাধ্য । এ-কথা ঠিক । আর এর থেকে শুরু করেছিলাম বলেই প্রথম অনুমানটা নির্ভুল হলো । কিন্তু দ্বিতীয় অনুমানটা ভুল । কেননা, তার বেলার যে-কথা বলে শুরু করা হচ্ছে সেই কথাটাই ভুল । ঠিক নয় । ধুঁয়ো থাকলেই যে বাঘ থাকতে বাধ্য তা বলা যায় না । যেখানেই ধুঁয়ো থাকবে সেখানেই যে বাঘ থাকবে, এমনতরো কথা একেবারের আজগুবি আর অসম্ভব ।
তাহলে, যে-কথাটির জোরে আমাদের অনুমানটা ঠিক হলো সেই কথাটিকে ভালো করে বিচার করা যাক । কী কথা?
যেখানেই ধুঁয়ো সেখানেই আগুন থাকতে বাধ্য ।
যেখানেই ম্যালেরিয়া সেখানেই মশার কামড় থাকতে বাধ্য । যেখানেই পেনিসিলিন সেখানেই নিউমোনিয়া-নিরাময় হতে বাধ্য ।
এগুলো সব নির্ভুল কথা ।
নির্ভুল অনুমান করতে হলে এই রকমেরই কোনো-না-কোনো নির্ভুল কথা থেকে শুরু করতে হবে । তাই এই ধরনের কথার বৈশিষ্ট্য ঠিক কী, গোড়ায় তাই বোঝবার চেষ্টা করা যাক ।
কেউ যদি বলতো, ‘কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় আগুন থাকলে ধুঁয়োও থাকে’, কিংবা, কেউ যদি বলতো ‘আগুন থাকলে ধুঁয়ো থাকা সম্ভব’, অর্থাৎ, বাধ্য নয়, শুধু সম্ভব,-তাহলে কি তাদের কথার উপর নির্ভর করেই আমি ওখানে ধুঁয়ো দেখে বলে দিতে পারতাম যে ওখানে আগুন আছে? নিশ্চয়ই নয় । কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধুঁয়ো থাকলে আগুন থাকে; অতএব এ-ক্ষেত্রেও ধুঁয়ো আছে বলেই যে আগুন থাকবে তার কোনো মানে নেই । আবার ধুঁয়ো থাকলে আগুন থাকা সম্ভব । শুধু এইটুকু জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হলে ওখানে ধুঁয়ো দেখে আমি বড়ো জোর বলতে পারতাম যে ওখানে আগুন থাকতে পারে । কিন্তু ‘থাকতে পারে’ আর ‘আছে’-দুটো এক কথা নয়: থাকতে পারে । মানে নাও থাকতে পারে ।
আমার অনুমানটা নির্ভুল হয়েছিলো । কেননা, আমি এমন একটি জ্ঞান থেকে শুরু করেছিলাম যে জ্ঞানের দুটো লক্ষণ ছিলো:
এক – জ্ঞানটা সব-দৃষ্টান্তের বেলায় সত্যি-শুধুমাত্র কোনো-কোনো দৃষ্টান্তটুকুর বেলাতেই যে সত্যি তা নয় ।
দুই – জ্ঞানটার মধ্যে একটা বাধ্য-বাধকাতার ভাব আছে-কথাটা শুধুমাত্র সম্ভব নয়, সুনিশ্চিত । (এই কথা শুনে একদল পণ্ডিত অবশ্যই খুব সোরগোল বাধিয়ে দেবেন । তাঁরা বলবেন, মানুষের জ্ঞান কখনোই সুনিশ্চিত হয় না । কোনো জ্ঞান হয়তো বেশি নিশ্চিত, কোনো জ্ঞান কম নিশ্চিত-বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞানগুলো বেশি নিশ্চিত আর সাধারণ ধারণাগুলো কম নিশ্চিত । এই ভাবে নিশ্চয়তার কম-বেশি হতে পারে । কিন্তু মানুষের পক্ষে কোন কথাই একেবারে সুনিশ্চিত বলে জানতে পারা সম্ভব নয় ।) কিন্তু আমরা এখন এ-তর্কে নাই বা গেলাম । আমরা কেবল বলবো, বৈজ্ঞানিকের জ্ঞান যতোখানি নিশ্চিত হতে পারে আমরা এখানে ততোখানি নিশ্চয়তাকেই ‘সুনিশ্চিত’ বলছি ।
(কেননা, বিজ্ঞান যে কী-শুধু সেইটুকু জানতে পারলেই আমরা আপাতত খুশী হয়ে যাবো) ।

