লেখক: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
প্রথম সংস্করণ অক্টোবর ১৯৮৩
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লেখা ছোটদের জন্য “বিজ্ঞান কি ও কেন ?” বইটি ছোট ছোট অধ্যায় পোস্ট আকারে দেয়া হচ্ছে । যেন খুব কম সময়ের মধ্যে এক একটি অধ্যায় পড়ে শেষ করা যায় ।
আজ দ্বিতীয় অধ্যায়টি দেয়া হলো ।
আগের অধ্যায়:
খবর পাবার খবর
খবর যে দেয় তাকেই বলবো খবর-দার । পাহারা-দার পাহারা দেয়, তেমন খবর-দার খবর দেয় । বাংলায়, খবর্দার বললে অবশ্য একটা হুঁশিয়ার হবার ইঙ্গিত থাকে । তার কারণ, বোধহয়, তখন খবর-দারেরা বড়ো একটা সুখবর দিতো না । বরং; বিপদ-আপদের খবরই দিতো ।
কিন্তু যে-পাঁচটি খবরদারের কথা এখন তুলছি তারা শুধুই বিপদ-আপদের খবর দেয় না । সব রকম খবর দেয় । খবরের ব্যাপারে তাদের কোনো বাছবিচার নেই ।
সামনে একটা সাপ দেখেই আমি তিনহাত ছিটকে গেলাম । সাপের খবরটা দিলো কে ? চোখ । এটা খুব সুখবর নয় । কিন্তু ওই চোখই তো খবর দিয়েছিলো, ছাদের টবে টুকটুকে লাল ফুল ফুটেছে । দেখে আমি কী মোহিতই না হয়েছিলাম !
আমাদের বাকি চারটি খবর-দারের বেলাতেও একই কথা । ভালো খবরটাও তারা দেয়, মন্দ খবরটাও তারা দেয়-এক কথায়, যা কিছু খবর তা ওদের কাছে পাওয়া ।
চোখ দিয়ে দেখা । কান দিয়ে শোন । নাক দিয়ে শোঁকা । জিভ দিয়ে চাখা ।
কিন্তু স্পর্শ করে জানাটা কার দরুন ?
তারা নাম হলো ত্বক ।
চোখ-জোড়া কপালের নিচে । কানজোড়া মাথার দু’পাশে । জিভটা মুখের ভেতর । আর নাকটা ঠোঁটের ওপর ।
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । ভাবলাম, খবর-দারগুলির চেহারা কেমন সে খবরটা নেওয়া যাক ।

আয়নায় চোখ-জোড়াকে দেখতে পেস্তা-চেরা মনে হলো, নাকটা বেশ একটু খাঁদা-খাঁদা লাগলো । কিন্তু তাই বলে দমে যাবার কারণ নেই । চোখ-জোড়া পেস্তা-চেরা মতো না হয়ে যদি পটল-চেরা হতো তাহলেও নজরটা তো বেশি তীক্ষ্ণ হতো না । তেমনি, নাকটাকে দেখতে খাটো বলেই খবর-দার হিসেবেও সে খাটো নয় ।
আসল কথা হলো, আয়নায় খবর-দারদের যে রূপ দেখলাম তা নেহাতই তাদের বাইরের রুপ-খোলসের মধ্যে যেন গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে । তাই খোলসের চেহারায় তফাত হলেই যে খবর-দারদেরও কেনো রকম ইতর-বিশেষ হয়ে যাবে, তার কোনো মানে নেই !
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খবর-দারদের দেখতে দেখতে আসল হাঙ্গামা হলো ত্বক-কে নিয়ে । ত্বক বলে খবর-দারটি গেলো কোথায় ?
আসলে, ত্বককে সনাক্ত করা অতো সহজ নয় । কেননা নাক-কানের মতো ত্বক তো আর শরীরের একটিমাত্র জায়গায় আটকা পড়ে নেই ।
ত্বক আছে হাতের চেটোয় । ত্বক আছে হাতের তেলোয় । ত্বক আছে পিঠে-সারাটা শরীর জুড়ে, চামড়ার তলায় গা ঢাকা দিয়ে ।
জুতোয় পেরেক উঠলে পায়ের তলায় যন্ত্রণা হয় । যন্ত্রনার খবরটা দেয় ত্বক ।
পিঠে ঘামাছি ফুটলে চিড়বিড় করে । চিড়বিড়িনির খবরটা দেয় ত্বক ।
গালে মশা কামড়ালে চুলকে ওঠে, মশা মারতে গালে চড় পড়লে জ্বালা করে-চুলকোনোর খবর আর জ্বালা করার খবর,-দুইই ত্বকের কাছ থেকে পাওয়া ।
এটা ঠাণ্ডা ওটা গরম, এটা কঠিন ওটা নরম, আর আহামরি তোমার মাথার টাকটি কী অপরূপ মসৃণ-এসব খবর কার কাছ থেকে পাওয়া ? তার নাম ত্বক ।
ফুলের রং আর গলার স্বর, নুনের স্বাদ আর চায়ের গন্ধ-ওঃ, কতো খবরই না পেয়ে গেলাম ।
কার খবর ? এক কথায় বলতে পারি, দুনিয়ার খবর । কেননা, ছাদের টবই হোক আর পাশের বাড়ির নেড়ীর গলাই হোক-দুনিয়া ছাড়া তো আর কিছুই নয় । সব-কিছুই হলো দুনিয়ার জিনিস । তাই এদের খবর পাওয়াা মানেই দুনিয়ার খবর পাওয়া ।
ওঃ, দুনিয়ায় কতো জিনিস । দুনিয়ার জিনিসের কি আর অন্ত আছে ? আমাদের খবর-দারগুলিও কম তুখোড় নয় । অনবরত রাশিরাশি দুনিয়ার খবর বয়ে আনছে ।
দুনিয়ার খবর পাওয়া মানেই হলো জ্ঞান পাওয়া । তাই এই খবর-দারগুলির কল্যাণে রাশিরাশি জ্ঞান পাচ্ছি । আমরা জ্ঞানী হয়ে উঠছি !
