লেমনেড (লেবু সরবত) বিক্রির দোকানের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টিং শেখা । ব্যবসা বা ব্যক্তিগত জীবনে হিসাব বা অ্যাকাউন্টিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ । টাকা আয় থেকে খরচ করা কঠিন । আর আয়-ব্যায় হিসাব রাখার মধ্যেই নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাবলম্বী বা স্বচ্ছল হওয়া ।
লেখক: ড্যারেল মুলিস এবং জুডিথ অরলফ
পৃষ্ঠা: ১৯৬ পৃষ্ঠা
প্রকাশ: ২০০৮
আমরা কিভাবে শিখি? এতদিন আমরা কত কছু শিখেছি । আবার ভুলে গিয়েছি । কিভাবে এত কিছু শিখেছি? আবার কতগুলো ভুলেও গিয়েছি! কেন ভুলে গেছি? কোন শেখাটা আমাদের মনে আছে আর কোনগুলো নেই? কেন মনে আছে আর কেন ই-বা মনে নেই, থাকে না? কিভাবে শিখলে সবচেয়ে ভালোভাবে শেখা যায়? প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রত্যেকের জন্যই আলাদা । এটাই স্বাভাবিক । আমাদের সবারই নিজস্বতা আছে, বিশেষ করে শেখার ক্ষেত্রে ।

লেখকদ্বয়ের মতে কোন কিছু শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তা হাতে কলমে করা । যা পড়ছি, শুনছি বা শিখছি তা সরাসরি কাজে লাগানাে । শুধু পুথিগত বিদ্যায় আবদ্ধ না থেকে তা সরাসরি সেই কাজে প্রয়োগ করা ।
অ্যাকাউন্টিং বা ব্যবসার হিসাব শেখানোর জন্য তাই লেখক একটি দোকান খুলেন । লেবুর সরবত বিক্রির দোকান । কারণ দিন শেষে হিসাব কাজে লাগবে কোন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে । তাই লেখক একটি দোকান খোলার মাধ্যমে পাঠককে অ্যাকাউন্টিং বা হিসাব শেখানাের সিদ্ধান্ত নেন । যাকে বলা হয় লেমনেড স্ট্যান্ড । তাও একটি স্কুল পড়ুয়া বাচ্চার মাধ্যমে । এই লেমনেড স্ট্যান্ড এর একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত ধরনের হিসাব আছে তা ধাপে ধাপে করেন । প্রতিটা অ্যাকাউন্টিং শব্দ বিশদ বর্ননা করেন ব্যবহারিক সহ । এটা একটা খেলার মতো । শূণ্য থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে খেলার মতো করে বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করা হয় । দেখানো হয় একটা ব্যবাসার একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কত ধরনের লেন-দেন হতে পারে এবং করতে হয় । কত কিছু চিন্তা করতে হয়, সিদ্ধান্ত নিতে হয় ।

খেলার ছলে লেখক আমাদের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখান । ছোট কাল থেকে আমাদের টাকা-পয়সা সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা দেয়া হয় । অর্থই অনর্থের মূল শেখানো হয় । যা আজীবন টাকা এবং তা সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে থাকতে হয় । যদিও অ্যাকাউন্টিং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাবার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার । অ্যাকাউন্টিং বা হিসাব সম্বন্ধে আমাদের সবারই ভয় কাজ করে । বিশেষ করে যারা এ বিষয়ে পড়াশুনা করে নি । লেখক সবার জন্য, সব ধরণের পাঠকের কথা বিবেচনা করে এই বইটি লিখেছেন । মজার ব্যপার হলো, এমন ভাবে লিখেছেন যেন ৮-১০ বছরের একটা বাচ্চাও খেলার ছলে অ্যাকাউন্টিং -এর মতো কঠিন বিষয় বা একটা ব্যবসার আদ্যেপান্ত, ছোট থেকে বড় সব বিষয় বুঝতে পারবে । শুধু বুঝতে পারবে না, নিজে করতেও পারবে । এর চেয়ে সহজ করে অ্যাকাউন্টিং বোঝানো প্রায় অবম্ভব বলা যায় ।

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে অনেকদিন ধরে পয়সা আকারে জমানো ৫ ডলার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এক স্কুল ছাত্র । সেখান থেকে সে অ্যাসেট, লায়াবিলিটি, একুইটি, ব্যালান্স শিট, ইনভেনটরি, আয় এবং ব্যায় সম্পর্কে ধারণা পায় এবং ব্যবসায় প্রয়োগ করে সেগুলো । নিজে নিজে বানায় এবং হিসাব রাখে । অ্যাসেট কত প্রকার কি কি সেটা বুঝতে হয় ।
অ্যাসেট বা সম্পদ হলো যা আমাদের পকেটে টাকা নিয়ে আসে । আর লায়াবিলিটি (দায় বা দেনা) হলো যা আমাদের পকেট থেকে টাকা বের করে ।
তারপর গ্রস প্রফিট, নেট প্রফিট, ইনকাম স্ট্যাটম্যন্ট, ক্যাশ ফ্লো ইত্যাদি সম্পর্কে জানে এবং সেগুলো তার ব্যবসায় ব্যবহার করে নেয় ।

তারপর সে লোন নেয় ব্যবসা বাড়ানোর জন্য । সেখানে শেখে রিটেইন্ড আর্নিং, লোন, ক্রেডিট, অ্যাকাউন্ট পেয়েবল, নোটস পেয়েবল ইত্যাদি ।
পরের পর্যায়ে তাকে শ্রমিকের খরচ, অ্যাকাউন্ট রিসিভেবল, বেড ডেব্ট, প্রিপেইড খরচ, অ্যক্রুল পদ্ধতি, নগদ পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয় । ব্যাংক লোন নেয় বলে তাকে ইন্টারেস্ট গুনতে হয় । সেটার হিসাব রাখতে হয় । এই লোন এবং ইন্টারেস্ট কোথায় কোন হিসাবে প্রভাব ফেলবে তা’ করতে হয় ।
লেমনেড স্ট্যান্ড এর পাশাপাশি কনসালটেন্সি সার্ভিস শুরু করে । সেটার হিসাব রাখতে হয় । একটা প্রোডক্ট বা পন্য আর অন্যটা সার্ভিস বা সেবা দানকারী ব্যবসা । দুটোর পার্থক্য, সুবিধা-অসুবিধা এবং কোনটার হিসাব কি ধরণের হবে সেটা দেখানো হয় । কোন ব্যবসায় কি গুরুত্বপূর্ণ তা লক্ষনিয় ।

লেবু, চিনি ইত্যাদি সহকারে লেবুর সরবত বানাতে হয় এবং বিক্রি করতে হয় । তাই ইনভেনটরি ম্যানেজমেন্ট করতে হয় । সেটার বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে বুঝতে হয় কোনটা তার জন্য উপযুক্ত । চলে আসে লিফু, ফিফু ।
তারপর ব্যবসার কাজে তাকে ক্যাশ স্ট্যাটমেন্ট বানাতে হয় । ফিক্সড এসেট কি কি আছে বের করতে হয়, ক্যাপিটালাইজেশন করতে হয় । ডেপ্রিসিয়েশন হিসাব এবং সেগুলো তার স্ট্যাটম্যান্ট এ দেখাতে হয় । সময়ের সাথে সাতে অ্যাসেটের দাম কমে । সেটা হিসাব করতে হয় । এর জন্যও কয়েক রকম পদ্ধতি আছে ।

লাভ এবং ক্যাশ কি আর ব্যবসায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় ব্যবসা করতে গিয়ে । অপরিকল্পিত ভাবে হঠাত ব্যবসার আকার বাড়িয়ে সমস্ত ক্যাশ ব্যয় করে ফেলে । সমস্ত ক্যাশ ব্যয় করে ব্যবসার আকার বাড়ানো কি প্রভাব ফেলে তা দেখানো হয় ।
ডেবিট বা খরচ যা আমার কাছ থেকে অন্যের কাছে চলে গেলো, বিনিময়ে ভবিষ্যতে আমি কিছু পাবো । ক্রেডিট বা ধার যা অন্যের কাছ থেকে আমার কাছে আসলো, যে দিয়েছে তাকে আবার ভবিষ্যতে সমপরিমাণ কিছু দিতে হবে ।
তারপর তাকে টেক্স এর মুখোমুখি হতে হয় । লিকুইডেশন বুঝতে হয় ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ।

সব শেষে তাকে পুরো ব্যবসার হিসাব-নিকাশ এ্যানালাইজ করতে হয় । কিভাবে ব্যবসায় লাভ বাড়ানো যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয় ।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলার ছলে অ্যাকাউন্টিংয়ের কঠিন সব বিষয়কে বাচ্চাদের বোঝার উপযোগী করে বোঝানো হয়েছে, সরাসরি করে দেখানো হয় । ফলে যে কেউ খুব সহজে বুঝতে পারে । ভুল হয়, ভুল থেকে কি শিক্ষা হলো সেটা গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় । সে শিক্ষা পরবর্তীতে কিভাবে কাজে লাগানো যায় দেখানো হয় ।
আমার কাছে বইটি একটি অসাধারণ কাজ বলে মনে হয়েছে । একটা ব্যবসা কিভাবে শুরু থেকে গঠন ও পরিচালনা করতে হয় তা শিখেছি । ব্যবসার এ বিষয় নিয়ে প্রশ্নগুলো আমার মধ্যে প্রায় ৪/৫ বছর যাবত ঘুরছে । কোথাও সহজ কোন উত্তর পাচ্ছিলাম না । এ বইটা আমার প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে ।
ব্যবসা করুন বা না-ই করুন । পড়ার আনন্দ পাবার জন্য হলেও বইটি পড়া উচিত । অ্যাকাউন্টিং এর মতো কঠিন বিষয়কে কিভাবে এত সহজ, সুন্দর, সাবলীল করে বুঝানো যায় তার উদাহরণ এই বই । লেখকদ্বয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ বইটি লেখার জন্য ।
